এক যুগ পর বুথে ব্যবসায়ী, ভোটের উৎসবে ভাসছে চট্টগ্রাম চেম্বার

 প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০৬:৩৮ অপরাহ্ন   |   চট্টগ্রাম

এক যুগ পর বুথে ব্যবসায়ী, ভোটের উৎসবে ভাসছে চট্টগ্রাম চেম্বার

নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম :

​চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে অবস্থিত দেশের প্রথম বাণিজ্যিক ভবন ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার’। আজ শনিবার সকাল থেকেই এই সুউচ্চ ভবনের নিচতলা রূপ নিয়েছে এক টুকরো উৎসবের ময়দানে। চারদিকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা, রঙিন ব্যানার, আর ব্যবসায়ী নেতাদের কোলাহল। শেষবার এই চত্বরে ভোটারদের এমন দীর্ঘ সারি আর উদ্দীপনা দেখা গিয়েছিল ২০১৩ সালে। দীর্ঘ এক যুগ বা ১২ বছর পর আবারও ব্যালট পেপারের মাধ্যমে নিজেদের নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ পেয়ে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মহলে বইছে আনন্দের হাওয়া। মাঝের বছরগুলোতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পর্ষদ গঠনের যে অলিখিত নিয়ম তৈরি হয়েছিল, তা ভেঙে এবার শতস্ফূর্ত এক ভোট উৎসবের সাক্ষী হচ্ছে দেশের প্রধান এই বাণিজ্য নগরী।

​আজ সকাল ৯টা থেকে শুরু হওয়া এই ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়াকে ঘিরে ভোটারদের মাঝে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। ঘড়ির কাঁটায় ভোট শুরুর সময় নির্ধারণ করা থাকলেও, সকাল ৮টা থেকেই অনেক প্রবীণ ও তরুণ ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রের সামনে উপস্থিত হতে দেখা যায়। বিরতিহীনভাবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলা এই নির্বাচনে ভোটারদের জন্য মোট ১৭টি বুথ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে ব্যবসায়ীদের এমন সরব উপস্থিতি বন্দর নগরীর ঝিমিয়ে পড়া বাণিজ্যিক রাজনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। এবারের নির্বাচনে একজন সাধারণ শ্রেণির ভোটার সর্বোচ্চ ১২টি এবং সহযোগী শ্রেণির ভোটার মোট ৬টি করে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

​চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (সিসিসিআই) নির্বাচন পরিচালনা কমিটি সূত্রে জানা গেছে, মূলত ২৪ সদস্যের একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠনের লক্ষ্যে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যবসায়ীদের প্রত্যক্ষ ভোটে সাধারণ শ্রেণি থেকে ১২ জন এবং সহযোগী শ্রেণি থেকে ৬ জন পরিচালক নির্বাচিত হন। এ ছাড়া টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ শ্রেণি থেকে ৩ জন করে আরও ৬ জন পরিচালক পর্ষদে যুক্ত হওয়ার কথা। তবে এবার এই দুই শ্রেণি থেকে ৩ জন করে মোট ৬ জন প্রার্থী আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পথে থাকায়, মূল লড়াইটি হচ্ছে সাধারণ ও সহযোগী শ্রেণির ১৮টি পদের জন্য। পরবর্তীতে এই নির্বাচিত ২৪ জন পরিচালকের অভ্যন্তরীণ ভোটে একজন সভাপতি ও দুজন সহসভাপতি নির্বাচিত হবেন, যারা আগামী দুই বছর এই শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের হাল ধরবেন।

​এবারের নির্বাচনে সাধারণ শ্রেণির ১২টি পদের বিপরীতে লড়াই করছেন ৩৭ জন প্রার্থী। যেখানে প্রধান দুই প্যানেলের ২৪ জন প্রার্থীর বাইরেও ১৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। অন্যদিকে, সহযোগী শ্রেণির ৬টি পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৫ জন প্রার্থী, যার মধ্যে প্যানেলভুক্ত ১২ জনের পাশাপাশি ৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীও ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। চেম্বারের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় এবার মোট ভোটারের সংখ্যা ৬ হাজার ৭৮০ জন। এর মধ্যে সাধারণ সদস্য ৪ হাজার ১ জন এবং সহযোগী সদস্য ২ হাজার ৭৬৪ জন। যেহেতু দীর্ঘ এক যুগ ধরে সাধারণ ব্যবসায়ীরা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি, তাই এবার ভোটের খরা কাটাতে অন্তত ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোট পড়বে বলে আশা করছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা।

​তবে এই উৎসবের আবহ সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন ছিল না। নির্বাচনের ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ গতকাল শুক্রবার হঠাৎ করেই এই নির্বাচনকে ‘প্রহসনের নির্বাচন’ আখ্যা দিয়ে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এস এম নুরুল হকের নেতৃত্বাধীন ‘সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ’। নির্বাচনী তফসিল অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় ব্যালট পেপারে এই প্যানেলের প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক বহাল থাকলেও, মাঠের লড়াইয়ে একা রয়ে গেছে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আমিরুল হকের নেতৃত্বাধীন ‘ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম’। আকস্মিক এই ভোট বর্জনের ঘোষণায় কিছুটা নাটকীয়তার সৃষ্টি হলেও, আজ মাঠের চিত্রে তার বড় কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। তৃণমূলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপের কর্ণধাররা স্বশরীরে এসে ভোট দিচ্ছেন।

​দুপুরের দিকে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে এসে ইউনাইটেড বিজনেস ফোরামের প্যানেল প্রধান আমিরুল হক তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানান, তাঁরা শুরু থেকেই চেয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা যেন ভোটের অধিকার ফিরে পান। এক যুগ পর সাধারণ ভোটারদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই প্রমাণ করে যে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা একটি গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চেয়েছিলেন। ভোটের মাধ্যমেই চেম্বারে প্রকৃত ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

​নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ রাখতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কেন্দ্রে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার সুব্রত বিশ্বাস দাসসহ তিনজন কর্মকর্তা। দুপুরের দিকে সুব্রত বিশ্বাস দাস সাংবাদিকদের জানান, অত্যন্ত উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ চলছে এবং ভোটারদের উপস্থিতি সন্তোষজনক। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই একটি পরিচ্ছন্ন ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্পন্ন করতে তাঁরা বদ্ধপরিকর। বিকেলে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হবে গণনা, আর এর মাধ্যমেই অবসান ঘটবে চট্টগ্রাম চেম্বারের এক যুগের ভোটহীন ইতিহাসের।

Advertisement
Advertisement
Advertisement