ধর্ষণের আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা: বাকলিয়ায় রণক্ষেত্র, পুলিশের গাড়িতে আগুন
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি :
সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের নির্মম ঘটনাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাকলিয়া। অভিযুক্ত আসামিকে নিজেদের হাতে আইনগত শাস্তির বদলে ‘গণপিটুনি’ দেওয়ার দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় ভয়াবহ সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও র্যাবকে মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করতে হয়। মধ্যরাত পর্যন্ত চলা এই সহিংসতায় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং বেশ কিছু যানবাহন ও দোকানপাট ভাঙচুর করা হয়। পুরো ঘটনায় পুলিশ, সাংবাদিক ও সাধারণ পথচারীসহ অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার দুপুরে, নগরীর বাকলিয়া থানার চরচাক্তাই নুর চেয়ারম্যান ঘাটা এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকার একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা গ্যারেজের কর্মচারী মনির নামে ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে ফুসলিয়ে ধর্ষণ করে। শিশুটির কান্নাকাটি ও শারীরিক অবস্থা দেখে পরিবারের লোকজন ঘটনাটি টের পেলে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসেন। মুহূর্তের মধ্যে খবরটি ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী গ্যারেজ ঘেরাও করে অভিযুক্ত মনিরকে ধরে গণধোলাই দেয়।
খবর পেয়ে বাকলিয়া থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং উত্তেজিত জনতার হাত থেকে মনিরকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়। একই সঙ্গে গুরুতর অসুস্থ ও রক্তাক্ত অবস্থায় ভুক্তভোগী শিশুটিকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।
তবে পুলিশ মনিরকে নিয়ে থানার উদ্দেশ্যে রওনা দিতে গেলেই বাধে মূল বিপত্তি। আইনি প্রক্রিয়ার ওপর ভরসা না রেখে উত্তেজিত জনতা দাবি তোলে, ধর্ষককে তাৎক্ষণিক ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য তাদের হাতে তুলে দিতে হবে। পুলিশ এই অন্যায় দাবিতে অস্বীকৃতি জানালে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসে বহদ্দারহাট-শাহ আমনত সেতু সংযোগ সড়কের বাকলিয়া থানার তুলাতলী সংলগ্ন পুরো এলাকা অবরুদ্ধ করে ফেলে। তারা পুলিশের গাড়ি আটকে অবরুদ্ধ করে রাখে এবং চারপাশ থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রাত ৮টার পর ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ এবং র্যাবের বিপুল সদস্য মোতায়েন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনতাকে বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করলে শুরু হয় তুমুল ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের একটি গাড়িতে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের লেলিহান শিখা ও ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায় এবং আশপাশের কয়েকটি দোকানেও ভাঙচুর চালানো হয়। আত্মরক্ষার্থে ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জের পাশাপাশি ব্যাপক টিয়ার শেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
রাত ১০টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কৌশলগতভাবে মূল অভিযুক্ত মনিরকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সক্ষম হলে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে কিছুটা শান্ত হয়। বাকলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কিশোর মজুমদার জানান, নিরাপত্তার স্বার্থে অভিযুক্ত মনিরকে অত্যন্ত গোপনীয় ও নিরাপদ হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
তবে মূল আসামিকে সরিয়ে নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে মধ্যরাতে আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে তুলাতলী ও সংলগ্ন মূল সড়ক। রাত পৌনে ১টার দিকে হাজার হাজার মানুষ অলিগলি থেকে বের হয়ে পুনরায় সংগঠিত হয়ে পুলিশের ওপর চড়াও হয়। শুরু হয় দ্বিতীয় দফার তুমুল সংঘর্ষ। পুলিশের মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেলের শব্দে পুরো বাকলিয়া এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের মাঝে পড়ে বিভিন্ন দোকানপাট, বিপণিবিতান ও বহুতল ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন সাধারণ পথচারী, ব্যবসায়ী ও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। এমনকি উত্তেজিত জনতার ঘেরাটোপে বেশ কিছু পুলিশ সদস্যও দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ হয়ে থাকেন।
গভীর রাত পর্যন্ত পুরো বহদ্দারহাট-শাহ আমনত সেতু সংযোগ সড়কটি থমথমে ও যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালান। এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে পুরো এলাকায় চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নতুন করে সহিংসতা এড়াতে পুরো বাকলিয়া ও চাক্তাই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) মোতায়েন রাখা হয়েছে এবং হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করতে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে।