ফ্যামিলি কার্ড নয়, এবার ‘জাস্টিস কার্ড’ চান হাসনাত আব্দুল্লাহ: বিচারহীনতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ

 প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ০৭:৪১ পূর্বাহ্ন   |   চট্টগ্রাম

ফ্যামিলি কার্ড নয়, এবার ‘জাস্টিস কার্ড’ চান হাসনাত আব্দুল্লাহ: বিচারহীনতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ

​ প্রতিবেদক | কুমিল্লা

​দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি এক অভিনব ও জোরালো দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক এবং কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। দেশে বিভিন্ন খাতের সুবিধাভোগীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ডের মতো নানা ধরনের কার্ড চালু করা হলেও আমজনতা এখনও কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। এই বঞ্চনার অবসান ঘটাতে তিনি সরকারের কাছে প্রতীকীভাবে ‘জাস্টিস কার্ড’ চালুর জোর দাবি জানান।

​বুধবার (২০ মে) সন্ধ্যায় কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে আয়োজিত এক বিশাল ও প্রাণবন্ত পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি দেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির এই বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে মুখরিত এই সভায় হাসনাত আব্দুল্লাহ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র সাধারণ মানুষকে ফ্যামিলি কার্ড কিংবা কৃষক কার্ড দিয়ে সাময়িক স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু যে মূল স্তম্ভের ওপর একটি রাষ্ট্র টিকে থাকে, সেই ন্যায়বিচারই আজ সমাজ থেকে হারিয়ে গেছে। মানুষ কার্ড পাচ্ছে, কিন্তু অধিকার পাচ্ছে না। আর ঠিক এই কারণেই আজ নাগরিকদের জন্য একটি ‘জাস্টিস কার্ড’ বা ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা পাওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।

​বক্তব্যের এক পর্যায়ে দেশের সেবা খাত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবক্ষয়ের কথা উল্লেখ করে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই সংসদ সদস্য। তিনি অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন আজ নানা সংকটে জর্জরিত। দেশের চিকিৎসা খাতে এখনও আইসিইউ সংকট প্রকট, যা সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলছে। অন্যদিকে যুবসমাজের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ঘুষ ছাড়া চাকরি পাওয়া আজ অলীক কল্পনায় পরিণত হয়েছে। এমনকি গ্রামীণ ও মফস্বল অঞ্চলের মানুষ আইনি প্রতিকার পাওয়ার জন্য যে থানায় যাবে, সেখানেও জেঁকে বসেছে কুখ্যাত দালালচক্র। থানাকেন্দ্রিক এই দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের কারণে সাধারণ ও নিরীহ মানুষ প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছে এবং তাদের ন্যায্য আইনি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

​জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে দাবি করে হাসনাত আব্দুল্লাহ দেশের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থা ও সুশাসনের চিত্রটি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সমাজে বিচারহীনতা, দুর্নীতি ও দমন-পীড়নের এক ভয়াবহ সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে, যা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। নাগরিকদের মনের ভাব প্রকাশের তথা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। এর পাশাপাশি গুম ও হত্যার মতো রোমহর্ষক ঘটনাগুলো সমাজ থেকে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘমেয়াদি বিচারহীনতার সংস্কৃতির ফলে সাধারণ মানুষের মন থেকে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা উঠে যাচ্ছে। অনেক ভুক্তভোগী এখন থানায় বা আদালতে গিয়ে বিচার পাওয়ার আশা এতটাই হারিয়ে ফেলেছেন যে, তারা চরম অন্যায় সহ্য করেও আর বিচার চাওয়ার সাহস বা আগ্রহ পাচ্ছেন না। বিচার চাওয়ার এই অনীহা সমাজের জন্য এক মহা বিপদের সংকেত বলে তিনি সতর্ক করেন।

​পথসভার সমাপনী বক্তব্যে তিনি সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দেশের মানুষের জন্য যতক্ষণ পর্যন্ত শতভাগ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সরকারের নেওয়া অন্য সব উন্নয়নমূলক উদ্যোগ ও জনকল্যাণমুখী প্রকল্প জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যাবে। কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই তিনি অবিলম্বে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নয়ন, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি দমন এবং দেশের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।

​উক্ত রাজনৈতিক পথসভায় কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শীর্ষ সারির নেতাকর্মীদের এক বিশাল সমাগম ঘটে। হাসনাত আব্দুল্লাহর এই দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন শিশির, জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তরিকুল ইসলাম, দলটির কেন্দ্রীয় নেতা রিফাত রশিদ এবং কুমিল্লা জেলা তত্ত্বাবধায়ক নাবিদ নওরোজ শাহসহ স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। উপস্থিত বক্তারাও দেশের সুশাসন ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় হাসনাত আব্দুল্লাহর ‘জাস্টিস কার্ড’-এর দাবিকে সময়োপযোগী বলে আখ্যা দেন এবং এই লক্ষ্য অর্জনে রাজপথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement