মেয়রের ছবি বনাম গ্রাফিতি: চট্টগ্রামে মধ্যরাতে বিএনপি ও এনসিপি মুখোমুখি, পুলিশি হস্তক্ষেপে শান্ত
বিশেষ প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম নগরের টাইগারপাস মোড়ে এক অভূতপূর্ব ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল গত মধ্যরাতে। জুলাই বিপ্লবের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজপথে মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসে নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। একদিকে মেয়র শাহাদাত হোসেনের পক্ষে স্লোগান, অন্যদিকে বিপ্লবের স্মৃতি রক্ষার দাবিতে পাল্টা স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যকে দুই পক্ষের মাঝখানে ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে অবস্থান নিতে হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) একটি সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত বিস্তৃত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলারে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখন সাদা রঙ দিয়ে মুছে ফেলার কাজ শুরু করে চসিক। এনসিপির নেতাকর্মীদের দাবি, চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন পরিকল্পিতভাবে জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস ও ছাত্র-জনতার ত্যাগের স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করছেন। এই অভিযোগ তুলে দলটির পক্ষ থেকে রাত ৮টায় টাইগারপাস মোড়ে একটি বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়। এনসিপির নেতাকর্মীরা ব্যানার নিয়ে পিলারের সামনে অবস্থান নিয়ে চসিক প্রশাসনের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে শুরু করলে সংঘাতের আবহ তৈরি হয়।
এনসিপির এই কর্মসূচির খবর ছড়িয়ে পড়লে নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরাও ঘটনাস্থলে জড়ো হতে থাকেন। তারা চসিক মেয়র তথা চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনের পক্ষে স্লোগান দিতে শুরু করেন। দুই পক্ষের মারমুখী অবস্থান ও ক্রমাগত স্লোগান-পাল্টা স্লোগানে টাইগারপাস মোড় এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, যা সাধারণ মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে। যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কায় স্থবির হয়ে পড়ে যান চলাচল। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে কোতোয়ালী ও খুলশী থানার বিপুলসংখ্যক পুলিশ। তারা দুই পক্ষের মাঝখানে শক্ত অবস্থান নিয়ে মানবঢাল তৈরি করে এবং দীর্ঘ চেষ্টার পর এনসিপির নেতাকর্মীদের বুঝিয়ে নিউ মার্কেট এলাকার দিকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়।
সংঘাতময় এই পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর রাত ১১টার দিকে নিজেই টাইগারপাস মোড়ে এসে উপস্থিত হন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের সামনে ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। মেয়র বলেন, জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরাম ছিলেন তাঁর নিজের কর্মী, যে মুরাদপুর থেকে মেয়রের মুঠোফোনে ছবি পাঠিয়ে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল। সেই আন্দোলনে ফ্যাসিবাদের দোসররা মেয়রের নিজের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ১৬টি গাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল উল্লেখ করে ডা. শাহাদাত দাবি করেন, চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত ভুক্তভোগী তিনি নিজেই। ফলে তাঁর পক্ষে গ্রাফিতি মুছে ফেলার নির্দেশ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
মেয়র আরও ব্যাখ্যা করেন যে, এক্সপ্রেসওয়ের পিলারগুলোতে আন্দোলনের পর প্রচুর রাজনৈতিক পোস্টার ও ব্যানার লাগিয়ে এর সৌন্দর্য নষ্ট করা হয়েছিল। চসিক কেবল সেই সব পোস্টার ও ময়লা পরিষ্কার করে পিলারগুলো নতুন করে রঙ করাচ্ছে, যাতে আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের দিয়ে আবারও সেখানে সুন্দর ও সুপরিকল্পিতভাবে জুলাই গ্রাফিতি ফুটিয়ে তোলা যায়। বিষয়টি তিনি আগেই এনসিপির তরুণদের বুঝিয়ে বলেছিলেন বলে দাবি করেন। মেয়রের মতে, একটি মহল উদ্দেশ্যমূলকভাবে নগরীতে বিশৃঙ্খলা ও উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য এই সাধারণ বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে মোড় দেওয়ার চেষ্টা করছে। চসিক প্রশাসন আন্দোলনের তরুণদের পাশে থেকে সবসময়ই কাজ করবে বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে মধ্যরাতের এই উত্তাপ থিতিয়ে এলেও, গ্রাফিতি ও নগরের সৌন্দর্য রক্ষা নিয়ে দল দুটির মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এখনো পুরোপুরি কাটেনি বলেই মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।