কন্যার কান্না অরণ্যে, শেষ নিঃশ্বাস ছাড়ল ক্ষুধার্ত মা হাতি

 প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ০১:১৮ অপরাহ্ন   |   চট্টগ্রাম

কন্যার কান্না অরণ্যে, শেষ নিঃশ্বাস ছাড়ল ক্ষুধার্ত মা হাতি

নাইক্ষ্যংছড়ি (বান্দরবান) প্রতিনিধি  

​সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে যেখানে একসময় খাদ্যের প্রাচুর্য ছিল, সেখানে আজ কেবলই হাহাকার। ক্ষুধার তীব্র জ্বালা আর জরাজীর্ণ শরীর নিয়ে লোকালয়ে নেমে এসেও শেষ রক্ষা হলো না এক মাতৃত্বের। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের কাগজী খোলা গ্রামে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে একটি অসুস্থ মা হাতি। তবে মৃত্যুর চেয়েও উপস্থিত জনতাকে বেশি কাঁদিয়েছে মায়ের অবর্তমানে একলা হয়ে যাওয়া এক অবুঝ হাতির শাবকের আর্তনাদ। প্রকৃতি আর মানুষের নির্মমতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পাহাড়ি বন্যপ্রাণের বিপন্ন অস্তিত্বের এক জীবন্ত দলিল হয়ে রইল এই ঘটনা।

​স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত শনিবার সকালে কাগজী খোলা এলাকার একটি ফসলি জমিতে বিশালাকার হাতিটিকে নিস্তেজ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন তারা। বনের গহীন থেকে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসা হাতিটি এতটাই দুর্বল ছিল যে, সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু সেই করুণ দৃশ্যের মধ্যেও সবার নজর কাড়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট হাতির শাবক। ক্ষুধার্ত ও অসুস্থ মাকে পাহারা দিচ্ছিল সে। লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে এবং মানুষের কোলাহলে আতঙ্কিত হয়ে শাবকটি চিৎকার করে ডাকাডাকি শুরু করে। একপর্যায়ে মায়ের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে গভীর আতঙ্কে সেটি আবার বনের দিকে ছুটে পালায়। অসহায় এক মায়ের সামনে থেকে তার সন্তানের এমন দূরে চলে যাওয়ার দৃশ্য উপস্থিত প্রতিটি মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে যায়।

​ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা বন বিভাগকে খবর দিলে ইদগাঁও বন বিভাগের একটি উদ্ধারকারী ও চিকিৎসক দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। বন বিভাগের ইদগাঁও রেঞ্জ কর্মকর্তা উজ্জ্বল জানান, হাতিটির অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ছিল। স্থানীয়দের সহায়তায় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সেটিকে প্রাথমিক ওষুধ ও স্যালাইন দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ধরনের চেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে রোববার সকালে হাতিটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। বন বিভাগের প্রাথমিক ধারণা, হাতিটির বয়স হয়েছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে পুষ্টিহীনতা ও বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিল সে।

​পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এই মৃত্যু কেবল একটি হাতির স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, বরং এটি পার্বত্য অঞ্চলের বনাঞ্চল ধ্বংস এবং বন্যপ্রাণীদের খাদ্য সংকটের এক নির্মম প্রতিফলন। ক্রমাগত পাহাড় কাটা, বনের ভেতরের প্রাকৃতির জঙ্গল কেটে বাগান করা এবং হাতির চলাচলের প্রাচীন পথ বা 'এলিফ্যান্ট করিডোর' অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার কারণে বনের প্রাণীরা চরম খাদ্য সংকটে ভুগছে। পেটের দায়ে হাতিরা প্রায়শই লোকালয়ে হানা দিচ্ছে এবং মানুষের তৈরি ফাঁদ কিংবা তীব্র পুষ্টিহীনতার শিকার হয়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। কাগজী খোলার এই মা হাতিটির মৃত্যু যেন প্রকৃতির সেই নিঃশব্দ কান্নারই বহিঃপ্রকাশ, যা আমাদের বন্যপ্রাণী সুরক্ষার ভঙ্গুর চিত্রটিকে আবারও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

Advertisement
Advertisement
Advertisement