তুচ্ছ ঘটনায় রণক্ষেত্র সরাইল: চার গ্রামের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আহত ২৫, টর্চ জ্বালিয়ে চলল তাণ্ডব
বিশেষ প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
রাত তখন প্রায় আটটা। চারদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎই সরাইলের আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল ধারালো অস্ত্রের ঝনঝনানি আর রণহুংকারে। গ্রামীণ ঘুটঘুটে অন্ধকারে এক অদ্ভুত দৃশ্যের অবতারণা হলো—শত শত মানুষের হাতে জ্বলছে টর্চলাইট, আর সেই আলোর ঝলকানিতে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার সদর ও চুন্টা ইউনিয়নে শুক্রবার রাতে ঘটে যাওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের নেপথ্যের কারণগুলো শুনলে যে কেউ পরিহাস মনে করতে পারেন, কিন্তু এর পরিণতিতে অন্তত ২৫টি পরিবারে এখন চলছে কান্নার রোল। একটি মাইক্রোবাসের হর্ন এবং মসজিদের ইমামতি নিয়ে সৃষ্ট এই তুচ্ছ ঘটনা শেষ পর্যন্ত চার গ্রামের মর্যাদার লড়াইয়ে রূপ নেয়।
ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার সন্ধ্যায়, সরাইল সদর ইউনিয়নের আলিনগর গ্রামের বাসিন্দা ও মাইক্রোবাস চালক মোহাম্মদ জয়ের একটি অবাধ্য হর্নকে কেন্দ্র করে। জয় যখন তার গাড়িটি নিয়ে পাঠানপাড়া এলাকা অতিক্রম করছিলেন, তখন রাস্তা আগলে দাঁড়িয়ে থাকা পথচারীদের সরানোর জন্য কয়েকবার হর্ন বাজান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন পাঠানপাড়া গ্রামের ইদ্রিস খাঁর মেয়েজামাই। "রাস্তা কি তোর বাপের?"—এমন একটি চিলতে কথা-কাটাকাটি মুহূর্তের মধ্যেই রূপ নেয় ব্যক্তিগত অহমিকায়।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হতেই এই ব্যক্তিগত বিরোধের খবর ছড়িয়ে পড়ে দুই গ্রামে। গ্রামের ‘সম্মান’ রক্ষার ডাক দিয়ে লাঠিসোঁটা, বল্লম ও টেঁটা নিয়ে মাঠে নামে আলিনগর ও পাঠানপাড়ার শত শত মানুষ। উত্তেজনা এখানেই থামেনি; মুহূর্তের মধ্যে এই আগুনে ঘি ঢালে পার্শ্ববর্তী আরও দুই গ্রাম। পাঠানপাড়ার পক্ষে অবস্থান নেয় জিলুকদার পাড়া এবং আলিনগর গ্রামের কাঁধে কাঁধ মেলায় সরাইল গ্রামের লোকজন। চার গ্রামের এই চতুর্মুখী লড়াইয়ে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। অন্ধকারে কে কাকে আঘাত করছে তা নিশ্চিত হতে সবার হাতে জ্বলে ওঠে টর্চলাইট। টর্চের আলো আর অস্ত্রের ঝিলিক মিলে এক বীভৎস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যাতে দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে রেহাই পায়নি সাধারণ পথচারীরাও।
এদিকে, এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই উপজেলার চুন্টা ইউনিয়নের চুন্টা গ্রামে জ্বলে ওঠে আরেক অশান্তির আগুন। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সামাজিক আধিপত্যের পূর্ববিরোধ এবং পবিত্র মসজিদে নামাজ পড়ানোকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে ছিল স্থানীয় সফরের গোষ্ঠী ও শ্রাবণের গোষ্ঠী। শুক্রবার রাতে এশার নামাজের পর দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি একপর্যায়ে প্রকাশ্য রূপ নেয়।
মুহূর্তের মধ্যে দুই গোষ্ঠীর শত শত মানুষ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রের মহড়া দিয়ে একে অপরের দিকে ধেয়ে যায়। ঘণ্টাব্যাপী চলা এই পাল্টাপাল্টি ধাওয়া আর ইটপাটকেল নিক্ষেপে পুরো চুন্টা গ্রামজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে প্রাণভয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন নারী ও শিশুরা। এই দুই পৃথক সংঘর্ষের ঘটনায় নারী ও বৃদ্ধসহ অন্তত ২৫ জন মারাত্মকভাবে জখম হয়েছেন। আহতদের চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বাতাস। আশঙ্কাজনক অবস্থায় বেশ কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
খবর পেয়ে সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনজুর কাদের ভূঁইয়ার নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। কয়েক ঘণ্টার যৌথ প্রচেষ্টায় এবং লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।
ওসি জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত রয়েছে এবং পুনরায় সংঘর্ষ এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে এই ঘটনায় এখনো কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ দায়ের করেনি। পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং ঘটনার মূল উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করতে অভিযান চালাচ্ছে। একটি হর্ন আর মসজিদের ভেতরের সামান্য ভুল বোঝাবুঝি কীভাবে এতটা রক্তক্ষয়ী রূপ নিতে পারে, তা নিয়ে এখন সরাইলজুড়ে চলছে আত্মসমালোচনা ও চাপা গুঞ্জন।