​রাজপথে অলি আহমদের হুঙ্কার: 'জুলাই সনদ বনাম ক্ষমতার টানাপোড়েন'

 প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ০৯:১৯ পূর্বাহ্ন   |   চট্টগ্রাম

​রাজপথে অলি আহমদের হুঙ্কার: 'জুলাই সনদ বনাম ক্ষমতার টানাপোড়েন'

​নিজস্ব প্রতিবেদক | চট্টগ্রাম

​সবেমাত্র বিকেলের তপ্ত রোদ ম্লান হয়ে আসছিল চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে। কিন্তু মিলনায়তনের ভেতরের আবহাওয়া ছিল উত্তপ্ত। জনাকীর্ণ সেমিনারে মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে যখন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমদ (বীর বিক্রম) কথা বলা শুরু করলেন, তখন পিনপতন নীরবতা। গত ১০ মে বিকেলে ১১ দলীয় ঐক্যের এই সেমিনার রূপ নিয়েছিল রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার এক মঞ্চে।

​জুলাই আন্দোলনের মূল সুর ও বিএনপির ‘ইউ-টার্ন

​বক্তব্যের শুরুতেই অলি আহমদ স্মরণ করিয়ে দেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সেই রক্তঝরা দিনগুলোর কথা। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, "জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য কেবল ক্ষমতা বদল ছিল না; এর মূল ভিত্তি ছিল সাংবিধানিক সংস্কার এবং সমাজ থেকে বৈষম্য নির্মূল করা।"

​তিনি একটি চাঞ্চল্যকর দাবি উত্থাপন করে বলেন, আন্দোলনের পর বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এলডিপিসহ সমমনা দলগুলোর অবস্থান ছিল স্পষ্ট—আগে বিচার, তারপর সংস্কার এবং সবশেষে একটি নতুন সংবিধান। অলি আহমদের মতে, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ ‘জুলাই সনদ’কে গণভোটের মাধ্যমে বৈধতা দিলেও সরকার গঠনের পর বিএনপি সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। আর এই নীতিগত বিচ্যুতিই আজকের রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণ বলে তিনি মনে করেন।

​সীমান্তের ওপারে ‘ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং’ ও মানবিক বিপর্যয়

​অলি আহমদের বক্তব্যে উঠে আসে প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের প্রসঙ্গও। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের সাবেক শাসক হাসিনার পরামর্শে সেখানে ‘ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং’ করা হয়েছে। তার দাবি, কারচুপির মাধ্যমে মমতাকে হারিয়ে শুভেন্দু অধিকারীকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে।

​এরপরই তিনি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতির বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে জেতার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি ক্ষোভের সাথে জানান, সেখানে মুসলমানদের গাড়ির পেছনে বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে নির্যাতন করা হচ্ছে, যা কোনো সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারে না।

​সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি: ‘চাটুকারদের বেষ্টনী ভাঙুন

​বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে কড়া ভাষায় কিছু পরামর্শ দেন। তিনি বলেন প্রধানমন্ত্রী আজ চাটুকারদের দ্বারা বেষ্টিত। আপনাকে এই মায়াজাল ছিন্ন করে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। মনে রাখবেন, নীতি-নৈতিকতা আর জনসমর্থন ছাড়া শুধু শক্তির জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না।

​তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম জিয়ার মর্যাদা রক্ষার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সারসহ নিত্যপণ্যের সংকট এবং ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে সরকারের নজর দেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

​একটি অশনি সংকেত

​কর্নেল অলি আহমদ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ বন্ধ না করলে এবং দ্রব্যমূল্যের কারণে জনগণের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে সরকার সামাল দিতে পারবে না। "সে সময় বিরোধী দলগুলো আঙুল চুষবে না,"—এমন প্রচ্ছন্ন হুমকির মধ্য দিয়েই তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।

​চট্টগ্রামের এই সেমিনার থেকে অলি আহমদের এই বক্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন করে আলোচনার ঝড় তুলেছে। জুলাই আন্দোলনের চেতনা কি তবে পথ হারাচ্ছে? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সচেতন মহলে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement