জনগণের পকেট কেটে লুটপাটের ঘাটতি পূরণ, তীব্র প্রতিবাদ জামায়াতের

 প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ১০:০৬ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

জনগণের পকেট কেটে লুটপাটের ঘাটতি পূরণ, তীব্র প্রতিবাদ জামায়াতের

অনলাইন ডেস্ক:

বিদ্যুৎ খাতে চলমান সিস্টেম লস ও ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ না করে, উল্টো গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণের ওপর চরম বোঝা চাপানো হচ্ছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘গণবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি অবিলম্বে বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারসহ লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছে। সরকারের এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটের সামনে একটি বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তীব্র রোদ ও গরম উপেক্ষা করে সকাল থেকেই দলটির হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ ব্যানার-ফেস্টুন হাতে সমাবেশস্থলে সমবেত হতে থাকেন। দুপুরের পর সমাবেশটি জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একের পর এক ব্যর্থতা দিয়ে তাদের যাত্রা শুরু করেছে। তারা জাতির সঙ্গে করা ওয়াদা ভঙ্গ করেছে এবং জুলাই সনদের মূল চেতনার সঙ্গে স্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই সরকার ক্ষমতায় এসেছিল, বর্তমান কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে তারা সাধারণ মানুষের সেই প্রত্যাশা থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

বিদ্যুতের এই দফায় মূল্যবৃদ্ধির কঠোর সমালোচনা করে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল অতীতের কিছু প্রাসঙ্গিক প্রতিশ্রুতি মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেন, চলতি বছরই সরকারের বিদ্যুৎমন্ত্রী সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে আগামী দুই বছরের মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না। অথচ সেই আশ্বাসের মাত্র তিন মাস পার হতে না হতেই সিলিন্ডার গ্যাসের দাম একলাফে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা বাড়ানো হলো এবং এর পরপরই বিদ্যুতের দামও প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হলো। মন্ত্রীদের এমন পরস্পরবিরোধী ও দায়িত্বহীন বক্তব্য সাধারণ মানুষকে চরম বিভ্রান্তি ও সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে ছয়টি স্লটে যেভাবে নতুন করে এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, তার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের প্রান্তিক ও দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ। মধ্যবিত্তদের জীবনযাত্রার ব্যয়ও এতে অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছে যাবে।

সমাবেশে অভিযোগ করা হয়, বিদ্যুৎ খাতের প্রকৃত সমস্যা ও অব্যবস্থাপনা আড়াল করতেই এই মূল্যবৃদ্ধি। বিদ্যুৎ সেক্টরে সিস্টেম লস ও ক্যাপাসিটি চার্জের নামে যে বিপুল অঙ্কের টাকা অপচয় ও লুটপাট হচ্ছে, তা বন্ধ করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ সরকারের নেই। দুর্নীতিবাজদের পকেট ভারী করার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে, যাদের পকেট কেটে এখন সরকারের ভুল নীতির ঘাটতি ভরাট করার চেষ্টা চলছে। বিশ্বজুড়ে যেখানে এখন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, সেখানে বর্তমান সরকার সেদিকে কোনো বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিচ্ছে না। উল্টো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের কঠিন শর্ত পূরণের জন্য দেশের মানুষের ওপর ‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার গোলাম নয় যে তাদের অন্যায় শর্ত মেনে জনগণের দুঃখ-কষ্ট বাড়িয়ে দিতে হবে।

আসন্ন ৭ জুনের সংসদ অধিবেশন ও নতুন বাজেট পেশের ঠিক আগমুহূর্তে এই ঘোষণা আসায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াত নেতা গোলাম পরওয়ার তার বক্তব্যে এই টাইমিং নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, আইএমএফের শর্ত বা বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জাতীয় সংসদে বিস্তারিত আলোচনা করা উচিত ছিল। কিন্তু সংসদকে উপেক্ষা করে, অধিবেশন শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে হঠাৎ করে এই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এটি স্পষ্টতই জাতীয় সংসদ ও জনগণের গণতান্ত্রিক রায়কে অবমাননা করার শামিল। নিয়ম রক্ষার্থেই যেন সংসদ চালানো হচ্ছে, কিন্তু মূল সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে পর্দার আড়ালে।

বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করে জনগণের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয় এই বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে। অন্যথায় অতীতে জনগণের ওপর জুলুম-অত্যাচার করে কোনো শাসকই পার পায়নি এবং তাদের শেষ পরিণতি কী হয়েছে, তা পেছনের ইতিহাসের দিকে তাকালেই বর্তমান সরকার বুঝতে পারবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ইউটিলিটি বিলের চাপে সাধারণ মানুষ এতটাই দিশেহারা যে, তারা এখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে মন্ত্রীদের দেখলেই ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিচ্ছে। গণমানুষের এই দেয়াল ঠেকে যাওয়া ক্ষোভকে হালকাভাবে না নিয়ে সময় থাকতে স্বাভাবিক ও দায়িত্বশীল উপায়ে দেশ পরিচালনার চেষ্টা করার আহ্বান জানানো হয়।

সমাবেশের সমাপনী বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল দেশের একটি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি জানান, তাদের দলের বিরোধীদলীয় নেতা আগেই ওয়াদা করেছেন যে সরকারের সব ভালো ও জনকল্যাণমুখী কাজে তারা পূর্ণ সহযোগিতা করবেন এবং একটি গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবেন। তবে একই সাথে তিনি সতর্ক করে দেন যে, জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো অন্যায় সিদ্ধান্ত বা গণবিরোধী পদক্ষেপ জামায়াতে ইসলামী কখনোই মুখ বুজে মেনে নেবে না এবং সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে রাজপথে তাদের শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement