এইচএসসি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা, পুলিশের বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও বাধ্যতামূলক সিসিটিভি নজরদারি
স্টাফ রিপোর্টার
আসন্ন এইচএসসি ও
সমমানের পরীক্ষা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নকলমুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন করতে কঠোর নিরাপত্তা ও
প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। এবার প্রথমবারের মতো
পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যরা বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার
করবেন। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং
সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়
জানিয়েছে, কেন্দ্রের ভেতর ও আশপাশে নিরাপত্তা জোরদারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষা
প্রশাসন এবং কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে। বহিরাগতদের প্রবেশ,
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অপচেষ্টা কিংবা যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি
থাকবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের গুজব, ভুয়া তথ্য বা
বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত সাইবার আইনে
ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন
ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার পরীক্ষা পরিচালনায়
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে। তিনি জানান, কোনো কেন্দ্রেই
সিসিটিভি স্থাপনে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রতিটি কেন্দ্রে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও মনিটর
থাকতে হবে এবং ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও সংরক্ষণের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে,
যাতে পরবর্তীকালে কোনো অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করা সম্ভব হয়।
পুলিশের বডি-ওর্ন
ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক
সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, এর মাধ্যমে পরীক্ষার্থীরা যেন কোনো নিষিদ্ধ ডিভাইস নিয়ে
কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি কেন্দ্রের বাইরে জারি
থাকা ১৪৪ ধারা লঙ্ঘন বা অনাকাঙ্ক্ষিত সমাবেশ প্রতিরোধেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
ঢাকা শিক্ষা
বোর্ডের সচিব অধ্যাপক কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, অনেক সময় স্থানীয় সন্ত্রাসী বা
বহিরাগতরা পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশের চেষ্টা করে। পুলিশের বডি-ওর্ন ক্যামেরায় ধারণ
করা ভিডিও প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে, যা নিরাপত্তা নিশ্চিত
করতে সহায়ক হবে।
পরীক্ষার্থীদের
দেহ তল্লাশি করা হবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জেসমিন তাসলিমা বানু বলেন, পরীক্ষার্থীদের
হয়রানি করা হবে না। তবে কেন্দ্রে প্রবেশের আগে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাই বা চেকিং
করা হবে।
এদিকে পরীক্ষায়
প্রযুক্তিনির্ভর জালিয়াতি ও অনিয়ম রোধে বিদ্যমান আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে
সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয় 'দ্য পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্সেস) (সংশোধন) অ্যাক্ট,
২০২৬'-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে। অনুমোদনের জন্য এটি শিগগিরই মন্ত্রিসভার বৈঠকে
উপস্থাপন করা হবে।
সংশোধিত আইনে
এসএসসি ও এইচএসসির পাশাপাশি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষাসহ সব ধরনের
সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাকে 'পাবলিক পরীক্ষা' হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখা
হয়েছে। একই সঙ্গে মোবাইল ফোন, স্মার্টওয়াচ, ব্লুটুথ, হেডফোন বা অন্য কোনো
ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে পরীক্ষায় প্রতারণাকে 'ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন' হিসেবে
সংজ্ঞায়িত করা হবে।
খসড়া আইনে ডিজিটাল
উপায়ে জালিয়াতি, উত্তরপত্রে কারসাজি, নম্বর পরিবর্তনের চেষ্টা, ফলাফল বিকৃতি কিংবা
পরীক্ষাসংক্রান্ত তথ্য হ্যাকিংয়ের মতো অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং
অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২ এপ্রিল
মন্ত্রিসভা আইনটির খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়। সে সময় সংঘবদ্ধ প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা
জালিয়াতি ও গুজব ছড়ানোর মতো অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি
টাকা জরিমানার প্রস্তাব ছিল। তবে পরবর্তী পর্যায়ে শাস্তির মাত্রা কমিয়ে সর্বোচ্চ
পাঁচ বছরের কারাদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান বাদ
দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে কার্যকর
পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০-এর আওতায় শুধু শিক্ষা বোর্ড পরিচালিত পাবলিক
পরীক্ষাগুলো রয়েছে। ফলে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা বা বিভিন্ন ভর্তি পরীক্ষায়
প্রশ্নফাঁস ও জালিয়াতির ঘটনায় এ আইন প্রয়োগের সুযোগ সীমিত। সংশোধিত আইন কার্যকর
হলে সেই সীমাবদ্ধতা দূর হবে।
শিক্ষা
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, চার দশকের পুরোনো আইনে বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর
অপরাধের অনেক দিকের সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই। তাই প্রশ্নফাঁস, গোপন ইলেকট্রনিক
যন্ত্রের ব্যবহার, সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানো এবং ফলাফল হ্যাকিংয়ের মতো নতুন
ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় আইনটি আধুনিকায়ন করা হচ্ছে।
এ বছরের এইচএসসি ও
সমমানের পরীক্ষা আগামী বৃহস্পতিবার দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একযোগে শুরু
হবে। এবারের পরীক্ষায় মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেবে।