পুতুলনাট্যের জাদুকর মুস্তাফা মনোয়ার

 প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ০৩:৪৭ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

পুতুলনাট্যের জাদুকর মুস্তাফা মনোয়ার
ডেক্স নিউজ: 

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মুস্তাফা মনোয়ার এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। চিত্রশিল্পী, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠক—প্রতিটি পরিচয়ের বাইরে তিনি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন দেশের পাপেট বা পুতুলনাট্য শিল্পকে নতুন রূপ দেওয়ার জন্য। ‘পাপেটম্যান’ নামে পরিচিত এই শিল্পী লোকজ ঐতিহ্যনির্ভর পুতুলনাট্যকে আধুনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করেন।

বাংলাদেশে পুতুলনাট্য একসময় গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ষাটের দশক থেকে মুস্তাফা মনোয়ার এ শিল্পমাধ্যম নিয়ে পরিকল্পিতভাবে কাজ শুরু করেন। দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক নাট্যকলা, আলোকসজ্জা, সঙ্গীত ও অভিনয়শৈলীর সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি পাপেট শিল্পকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যান। তার উদ্যোগে পুতুলনাট্য কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং শিশুদের শিক্ষা ও মানবিক বিকাশের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে পরিচিতি পায়।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি শিল্পকে মানুষের সংগ্রামের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে পাপেট প্রদর্শনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দেন এবং উদ্বাস্তু মানুষের মনে সাহস ও আশার সঞ্চার করেন। ‘আগাছা’, ‘রাক্ষস’ এবং ‘একজন সাহসী কৃষক’সহ তার বেশ কয়েকটি পাপেট প্রযোজনা দর্শকদের গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’ মুস্তাফা মনোয়ারের সৃজনশীলতার অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন। পাপেটের মাধ্যমে গল্প, লোককাহিনি, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক বার্তা উপস্থাপনের এ আয়োজন দীর্ঘদিন শিশু-কিশোরদের কাছে জনপ্রিয় ছিল। দেশীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে আনন্দঘন পরিবেশে শিশুদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

স্বাধীনতার পর দেশের পাপেট শিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রেও ছিল তার অগ্রণী ভূমিকা। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে তিনি প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের গড়ে তুলেছেন। তার হাত ধরেই দেশে পাপেট নির্মাণ, পরিচালনা ও গবেষণার একটি সুসংহত ধারা বিকশিত হয়।

শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং দেশপ্রেমের মতো বিষয়গুলো তিনি অত্যন্ত সহজ ও আনন্দময় উপায়ে পাপেটের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, আনন্দের সঙ্গে উপস্থাপিত শিক্ষা শিশুদের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পাপেট শিল্প নিয়ে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফর করেছেন। নিজের পাপেট দল এবং বাংলাদেশের লোকজ পাপেট দল ‘ধনমিয়া’কে নিয়ে মস্কো ও তাশখন্দ সফরে গিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের লোকজ পাপেটকে পরিচিত করে তোলেন। তার নির্মিত শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান ‘ক’ ও ‘খ’ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসা ও পুরস্কার অর্জন করে। ১৯৮২ সালে কলম্বোয় অনুষ্ঠিত ‘অ্যানিমেশন অ্যান্ড পাপেট ফর টেলিভিশন’ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশেষজ্ঞ হিসেবে অংশগ্রহণ করে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

কর্মজীবনের শুরুতে মুস্তাফা মনোয়ার পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে স্টেশন প্রডিউসার হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া জাতীয় পারফর্মিং আর্টস একাডেমি, জাতীয় সম্প্রচার একাডেমি এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও তিনি নিয়োজিত ছিলেন। বিটিভির জনপ্রিয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতা ‘নতুন কুঁড়ি’ চালুর পেছনেও তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান। শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনদের মতে, বাংলাদেশে পাপেট শিল্পের যে শক্ত ভিত্তি আজ প্রতিষ্ঠিত, তার বড় অংশই নির্মিত হয়েছে মুস্তাফা মনোয়ারের হাত ধরে। তিনি শুধু একজন শিল্পী নন; তিনি একটি শিল্পধারার প্রবর্তক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপকার। তার সৃষ্টিশীল কর্ম ও দর্শন আগামী প্রজন্মকে দীর্ঘদিন অনুপ্রাণিত করবে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement