বাজেটে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর; কালো টাকা সাদা করার বিধান প্রত্যাহারের দাবি

 প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ০৩:১৭ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

বাজেটে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর; কালো টাকা সাদা করার বিধান প্রত্যাহারের দাবি

ডেক্স  নিউজ:

জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রস্তাবিত বাজেটে একাধিক সংশোধনী আনার আহ্বান জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষের করের চাপ কমানো, বিতর্কিত কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল, দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং উচ্চশিক্ষা খাতকে আরও সহায়ক পরিবেশ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সোমবার জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বাজেট কেবল একটি অর্থবছরের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার একটি রূপরেখা। তিনি সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলকেও দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময় দেশের ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার খাত গভীর সংকটের মুখে পড়েছিল। বিশেষ করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি ও হতাশার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, বর্তমান সরকার দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বিনিয়োগের উপযোগী একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে কাজ করছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার প্রসঙ্গে তিনি জানান, ইতোমধ্যে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন ব্যাংক আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী সংস্থার সঙ্গে একাধিক গোপনীয়তা চুক্তি করেছে। দেশি-বিদেশি আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব অর্থ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

কর ব্যবস্থাকে আরও জনবান্ধব করার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব আহরণে করের হার বৃদ্ধি নয়, বরং করের আওতা সম্প্রসারণ ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী কর বছরগুলোতে করমুক্ত আয়ের সীমা পর্যায়ক্রমে ৪ লাখ, ৪ লাখ ৫০ হাজার এবং ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা যেতে পারে।

জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বিশেষ বিধান নিয়ে জনমনে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে— এমন ধারণা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ব্যাংক হিসাব খোলা, সম্পত্তির মিউটেশন ও বণ্টননামা নিবন্ধনের ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন।

উচ্চশিক্ষা খাতের উন্নয়নে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এর বিনিময়ে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার, ভাষা শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

তরুণ উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বাজেটে ঘোষিত ৫০০ কোটি টাকার স্টার্ট-আপ তহবিলকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া ডিজিটাল অর্থনীতিকে উৎসাহিত করতে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সার্চ ইঞ্জিনে বিজ্ঞাপনের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাবও দেন তিনি।

দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও কর কমানোর আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। চিংড়ি শিল্প, ওষুধশিল্প, পিভিসি ও পেট রেজিন, ফায়ার ডোর, বৈদ্যুতিক তার এবং ক্যাশনাট প্রক্রিয়াজাত শিল্পের জন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি এলইডি লাইট ও প্রিফ্যাব্রিকেটেড ভবন শিল্পের জন্য বিদ্যমান কর-সুবিধার মেয়াদ বাড়ানোরও আহ্বান জানান।

ভ্যাট কাঠামো আরও ব্যবসাবান্ধব করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণ ও রৌপ্য অলংকার, মাছ সরবরাহ এবং বিটিআরসির রাজস্ব ভাগাভাগির ওপর আরোপিত ভ্যাট পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব করেন। এছাড়া স্থানীয়ভাবে ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাস উৎপাদনে ভ্যাট কমানোর সুপারিশও করেন তিনি।

বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের আস্থা অর্জনই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। বিচার বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য অতিরিক্ত ১০০ কোটি টাকা এবং আইন মন্ত্রণালয়ের জন্য আরও ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেন তিনি। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

বক্তব্যের শেষাংশে পরিবেশবান্ধব যান হিসেবে সাইকেলের ওপর আরোপিত সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার জন্য অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কারসহ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

Advertisement
Advertisement
Advertisement