ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে ক্ষোভে ফুঁসছে অবহেলিত দুর্গত মানুষ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভেনেজুয়েলার উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরায় গত বুধবার আঘাত হানা শক্তিশালী যুগ্ম ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া স্বজনদের উদ্ধারে সরকারের ধীরগতি ও উদাসীনতার অভিযোগে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ভয়াবহ এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ৭০০ জন নিহত হয়েছেন। অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ একে দেশটির ইতিহাসের ‘সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
লা গুয়াইরার একটি ১২ তলা আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়ার পর উদ্ধারকর্মীরা জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশায় ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন। উদ্ধার অভিযানের সময় সম্ভাব্য জীবিত মানুষের সাড়া শনাক্ত করতে বারবার চারপাশে নীরবতা বজায় রাখা হচ্ছে। তবে বহু পরিবার অভিযোগ করেছে, উদ্ধার অভিযান শুরু হতে অযথা বিলম্ব হয়েছে এবং মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়ায় অনেকের প্রাণহানির আশঙ্কা বেড়েছে।
ধসে পড়া ভবনের বাসিন্দা ৩৪ বছর বয়সী অ্যাঞ্জেলের বাবা মিগুয়েল অস্কার নুনেজ বলেন, তার ছেলে এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকতে পারেন। তিনি অভিযোগ করেন, ভূমিকম্পে নয়, বরং সময়মতো উদ্ধার না পাওয়ার কারণে যদি তার ছেলের মৃত্যু হয়, তবে তার দায় কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। একই ভবনের বাসিন্দা কেভিন মন্টিয়া জানান, ভূমিকম্পের সময় তিনি কর্মস্থলে থাকলেও তার স্ত্রী লুজমারি ও ১৬ বছর বয়সী মেয়ে জোহেরলিয়েজমার বাসায় ছিলেন। তার দাবি, শুরুতে স্থানীয় বাসিন্দারাই উদ্ধারকাজে এগিয়ে এসেছিলেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে এলেও কার্যকরভাবে অংশ নেয়নি। পরে ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার উদ্ধারকারী দল, খননযন্ত্র এবং ক্রেন মোতায়েন করা হলেও পরিবারের সদস্যদের মতে, তা অনেক দেরিতে এসেছে।
ধসে পড়া ভবনটি সরকারি মালিকানাধীন আবাসন প্রকল্পের অংশ হওয়ায় সেখানে উদ্ধার তৎপরতা তুলনামূলক বেশি দেখা গেলেও লা গুয়াইরার অনেক এলাকায় এখনও উদ্ধারকারী দল পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। নিখোঁজ দুই কিশোরী কন্যা গ্রেইডেলিস ও গ্রেবেলিসকে খুঁজতে হাসপাতাল ও বিভিন্ন স্থানে ছুটে বেড়ানো একক মা ডেইলিসবেথ হেরেইরা বলেন, তার বাড়ির ধ্বংসস্তূপ সরাতে কোনো উদ্ধারকারী দল বা ভারী যন্ত্র পাঠানো হয়নি। তিনি বলেন, যেন স্বজনদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব সম্পূর্ণ তাদের নিজেদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
উপকূলসংলগ্ন বেলো হরিজন্তে আবাসিক কমপ্লেক্সের দুটি বহুতল ভবনও মাটিতে মিশে গেছে। সেখানে স্বেচ্ছাসেবী ও স্থানীয় বাসিন্দারা মাস্ক, দস্তানা, কোদাল ও লোহার রড নিয়ে নিজেরাই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খোঁজ করছেন। নিখোঁজ চাচাকে খুঁজতে থাকা উইলিয়াম রদ্রিগেজ বলেন, অনেক জায়গায় সাহায্য অত্যন্ত দেরিতে পৌঁছেছে, আবার কোথাও এখনো পৌঁছায়নি। ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তারা উদ্ধারকাজে অংশ নেয়নি বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
বাড়িঘর হারানো ৬০ বছর বয়সী হুয়ান আভেন্দো জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষের আর্তচিৎকার শুনে তিনি ও তার স্বজনেরা খালি হাতে ধ্বংসাবশেষ সরাতে শুরু করেন। পরে তারা এক নারীকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম রাতে অন্ধকারের কারণে কিছুই করা সম্ভব হয়নি। পরদিন সকালে ধ্বংসস্তূপের ভেতরে আটকে থাকা ওই নারীর কাছে প্রথমে পানি পৌঁছে দেওয়া হয়, এরপর দীর্ঘ চেষ্টায় তাকে বের করে আনা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি অগ্নিনির্বাপক বাহিনী ভূমিকম্পের প্রায় দুই দিন পর ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরে এল সালভাদর ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী দলও সহায়তায় যোগ দেয়। কয়েকজন জীবিতকে উদ্ধার করার পর রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অসংখ্য মানুষের মরদেহ চাপা পড়ে আছে এবং তাদের অনেকের দেহ হয়তো আর কখনও উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। ফলে এই ভয়াবহ দুর্যোগে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা হয়তো কোনো দিনই পুরোপুরি জানা যাবে না।
সূত্র: বিবিসি