রাজধানীতে স্বস্তি, জেলায় এখনো বিদ্যুৎ সংকট; বহু এলাকায় অব্যাহত লোডশেডিং

 প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ১১:৫১ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

রাজধানীতে স্বস্তি, জেলায় এখনো বিদ্যুৎ সংকট; বহু এলাকায় অব্যাহত লোডশেডিং

ডেক্স নিউজ:

জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, আগের দিনের তুলনায় সোমবার দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে এবং লোডশেডিং অনেকটাই কমে এসেছে। তবে মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন জেলায় এখনো বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের প্রধান কারণ হয়ে রয়েছে।

বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্তত ১৪টি জেলায় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় নিয়মিত লোডশেডিং করতে হয়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুতের ঘাটতি ৩০ থেকে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এর প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, মৎস্য, পর্যটন এবং শিক্ষা কার্যক্রমে।

সংসদে বিদ্যুৎমন্ত্রী জানান, কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু হওয়ায় উৎপাদন বেড়েছে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দুপুরে এক ঘণ্টার লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৩৩৯ মেগাওয়াট। তবে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, দিনের সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয় ভোর ৬টায়, যা ছিল এক হাজার ৬০ মেগাওয়াট। আগের দিন এ ঘাটতি ছিল প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট। বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমে আসায় সামগ্রিক চাপও হ্রাস পেয়েছে।

জেলাভিত্তিক পরিস্থিতি

পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় বিদ্যুৎ সংকটের কারণে রোববার রাত থেকে সোমবার বিকেল পর্যন্ত ১৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। সাড়ে ১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৭ মেগাওয়াট সরবরাহ পাওয়ায় হোটেল, বরফকল এবং মৎস্য খাত ক্ষতির মুখে পড়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৪৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ৯৯ মেগাওয়াট। ফলে শহরে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা এবং গ্রামাঞ্চলে আরও দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হয়েছে।

বরগুনায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে সংকটাপন্ন। ওজোপাডিকো ও পল্লী বিদ্যুতের উভয় ক্ষেত্রেই চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করতে হয়েছে। এতে বরফ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় মৎস্য ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়েছেন এবং কোথাও কোথাও মাছ সংরক্ষণেও সমস্যা দেখা দিয়েছে।

খুলনা অঞ্চলে রোববার রাত থেকে সোমবার বিকেল পর্যন্ত কিছু এলাকায় সাতবার পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ৭৭৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬৭৩ মেগাওয়াট।

রাজবাড়ীতে দিনের বেলায় ৮০ থেকে ৮৫ মেগাওয়াট এবং রাতে ৯৫ থেকে ৯৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৩০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় শহর ও গ্রামে ঘন ঘন লোডশেডিং হয়েছে।

বগুড়ায় শহর এলাকায় প্রায় ১০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে গড়ে ২০ শতাংশ লোডশেডিং হয়েছে। ৯৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সেখানে সরবরাহ ছিল ৮৫ মেগাওয়াট।

শরীয়তপুরে ১২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ায় প্রায় ৪২ শতাংশ ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে জেলার বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা দেখা দিয়েছে।

পিরোজপুরেও চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় প্রতিদিন গড়ে চার ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে।

কুমিল্লায় আগের দিনের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। রোববার বিভিন্ন এলাকায় ১৩ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং হলেও সোমবার বিকেলের পর সরবরাহ অনেকটাই স্বাভাবিক হয়।

মৌলভীবাজারে রোববার ব্যাপক লোডশেডিং থাকলেও সোমবার ভোর থেকে তিনটি গ্রিডে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।

সিলেটে ২৩০ থেকে ২৪৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১৪০ থেকে ১৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় নগর ও গ্রামউভয় এলাকায় কয়েক ঘণ্টা করে লোডশেডিং অব্যাহত রয়েছে।

এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, ঝিনাইদহ ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়ও বিদ্যুৎ সংকটের খবর পাওয়া গেছে। জগন্নাথপুরে দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে স্থানীয় বাসিন্দারা স্মারকলিপি দিয়েছেন। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার কিছু এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ শহরে পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকলেও গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট অব্যাহত রয়েছে।

সামগ্রিকভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও রাজধানীর বাইরে অনেক জেলায় এখনো সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়ে গেছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে নিয়মিত লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি সহ্য করতে হচ্ছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement