ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলায় মৃত্যুগন্ধে হাসপাতালগুলোর প্রাণপণ লড়াই অব্যাহত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গত বুধবার আঘাত হানা পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হয়েছে। বহু বছর ধরে অর্থনৈতিক সংকট, সরকারি অব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে দুর্বল হয়ে পড়া দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা এই দুর্যোগ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। ধ্বংসস্তূপে এখনও নিখোঁজ অসংখ্য মানুষকে উদ্ধারের চেষ্টা চললেও সময় যত গড়াচ্ছে, জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষ থেকে পচনশীল মরদেহের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে, যা বিপর্যয়ের ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
কারাকাসের ডা. হোসে ম্যানুয়েল দে লস রিওস শিশু হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে একসময় ১০ জন রোগী চিকিৎসা পেলেও বর্তমানে চিকিৎসক, ওষুধ, ভেন্টিলেটর ও অন্যান্য জরুরি সরঞ্জামের সংকটে মাত্র চারজনকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসাধীন শিশুদের মধ্যে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরী রয়েছে, যে একটি বহুতল ভবন ধসে গুরুতর আহত হয়েছে। হাসপাতালটিতে ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ শিশুর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, ভূমিকম্পের আগেও দেশের কোনো হাসপাতাল দৈনন্দিন রোগীর চাপ সামলাতেই সক্ষম ছিল না; এমন বড় দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা তাদের ছিল না।
সরকারের সর্বশেষ হিসাবে ভূমিকম্পে এক হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) মনে করছে, ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এই দুই ভূমিকম্পে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক দশ হাজারে পৌঁছাতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা কখনও জানা নাও যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সোমবার লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে ধ্বংসস্তূপ থেকে ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করেছেন ইকুয়েডরের উদ্ধারকর্মীরা। তবে উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর বেঁচে থাকার গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা অতিক্রম করায় এখন জীবিত কাউকে উদ্ধারের ঘটনা খুবই বিরল হয়ে উঠবে। সাধারণত পানি ছাড়া মানুষ তিন দিনের বেশি টিকে থাকতে পারে না।
ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাসের অন্তত ৪৩২টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকার স্কুল বন্ধের মেয়াদ বাড়িয়েছে এবং যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অক্ষত রয়েছে, সেগুলোকে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসক ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর অন্তত আটটি হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। চালু থাকা হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি ব্লিচ ও জীবাণুনাশকের মতো মৌলিক পরিচ্ছন্নতা সামগ্রীরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বহু দক্ষ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী বিদেশে চলে যাওয়ায় স্বাস্থ্যখাত আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। একইভাবে শিক্ষক সংকটও আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। চলতি বছরের শুরুতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক করার পর দেশটিতে কিউবার দীর্ঘদিনের চিকিৎসা মিশনও বন্ধ হয়ে যায়, ফলে বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে।
রাজধানীর ধসে পড়া ভবনগুলোর সামনে এখনও স্বজনদের অপেক্ষা থামেনি। অনেক পরিবার দিনরাত ধ্বংসস্তূপের পাশে অবস্থান করছে, যদি কোনো অলৌকিকভাবে প্রিয়জনের সন্ধান মেলে। এমনই একজন মিরেইয়া হেরেরা, যিনি তার ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিদের খোঁজে প্রতিদিন ধসে পড়া ভবনের সামনে অপেক্ষা করছেন। ভবনটির আটতলার বাসিন্দাদের তালিকায় এখন পর্যন্ত ১২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে, তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং আরও ২০ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। গত দুই দিনে সেখানে আর কাউকে জীবিত বা মৃত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবুও তিনি বিশ্বাস করেন, তার ছেলে এখনও জীবিত এবং উদ্ধারকারীদের অপেক্ষায় আছে।
সোমবার ভোরে আবারও ৪ দশমিক ৯ মাত্রার একটি আফটারশক অনুভূত হলে আতঙ্কে মানুষ ঘরবাড়ি ও আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে। সরকার জানিয়েছে, এতে নতুন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে আগের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ায় বাসিন্দাদের অনেকেই এখনও নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারছেন না। বিভিন্ন এলাকায় ভবনের নিরাপত্তা মূল্যায়নে সবুজ, হলুদ ও লাল রঙের সংকেত ব্যবহার করা হচ্ছে। সবুজ ভবন বসবাসের উপযোগী, হলুদ মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ এবং লাল চিহ্নিত ভবন সম্পূর্ণ অনিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ৭৮ বছর বয়সী সোলেদাদ কাম্পোস আপারিসিও জানান, উদ্ধারকাজ চলায় কর্তৃপক্ষ তাকে নিজের বাসায় থাকতে দিচ্ছে না। অসুস্থ ও আহত অবস্থায় একা জীবনযাপন করলেও নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে এখনও ভবনের বাইরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
সূত্র:সিএনএন