মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বদলে দিচ্ছে ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাষ্ট্রব্যবস্থা

 প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০১:৪৭ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বদলে দিচ্ছে ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাষ্ট্রব্যবস্থা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ক্রমেই দেশটির রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে। অভিবাসন, নির্বাচন, নাগরিকত্ব, ট্রান্সজেন্ডার অধিকার, সামাজিক মূল্যবোধ, করপোরেট নিয়ন্ত্রণ এবং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে একের পর এক রায় দেশটির রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে প্রভাবিত করছে। ফলে আদালত এখন শুধু সংবিধানের ব্যাখ্যাকারী নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের অকার্যকারিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নে ব্যর্থতার কারণে বহু জটিল প্রশ্নের নিষ্পত্তি এখন সুপ্রিম কোর্টের ওপর এসে পড়ছে। অভিবাসন সংস্কার, নির্বাচন ব্যবস্থা কিংবা সামাজিক অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়ায় আদালতের রায়ই কার্যত নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস আদালতের ভূমিকা কেবল আইন ও সংবিধানের নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা হিসেবে তুলে ধরলেও সাম্প্রতিক বাস্তবতায় আদালতের সিদ্ধান্তগুলো দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় গভীর প্রভাব ফেলছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আদালতের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা বারবার পরীক্ষা করার ট্রাম্পের পদক্ষেপ আদালতকে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ মামলার মুখোমুখি করেছে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে ট্রাম্প ফেডারেল ট্রেড কমিশনের (এফটিসি) নেতৃত্বে প্রেসিডেন্টের হস্তক্ষেপের ক্ষমতা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ পান। ১৯৩৫ সালের একটি নজির পরিবর্তনের মাধ্যমে আদালত জানায়, স্বাধীন সংস্থাগুলোর প্রধানদের অপসারণে কংগ্রেসের আরোপিত সীমাবদ্ধতা সব ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। এর ফলে এফটিসি, নিউক্লিয়ার রেগুলেটরি কমিশন এবং ন্যাশনাল লেবার রিলেশনস বোর্ডের মতো সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা দুর্বল হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সমালোচকেরা।

এই রায়ের পর ট্রাম্প একে গত একশ বছরে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেন। তবে সাবেক এফটিসি কমিশনার রেবেকা কেলি স্লটার সতর্ক করে বলেছেন, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হলে বড় করপোরেশনগুলোর ওপর কার্যকর নজরদারি দুর্বল হবে এবং সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এর আগে ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের আরেকটি ঐতিহাসিক রায়ে সাবেক প্রেসিডেন্টদের দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে বিস্তৃত ফৌজদারি দায়মুক্তি স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর প্রেক্ষাপটে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। সমালোচকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা আরও বিস্তৃত করার সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করেছে।

তবে আদালত সব ক্ষেত্রেই ট্রাম্পের পক্ষে অবস্থান নেয়নি। চলতি বছর জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক কার্যকর করার আইনি ভিত্তি আদালত প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং রায় দেয় যে প্রচলিত আইন প্রেসিডেন্টকে এমন ক্ষমতা দেয় না। একইভাবে ডাকযোগে নির্ধারিত সময়ের পর পৌঁছানো কিছু ব্যালট গণনার অনুমতি বহাল রেখে মিসিসিপির নির্বাচন আইনকে সমর্থন জানিয়ে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির আবেদনও খারিজ করে দেয় আদালত। ওই মামলায় প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস ও বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেট আদালতের উদারপন্থী বিচারপতিদের সঙ্গে একমত হন।

অন্যদিকে, অভিবাসন সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় আদালতের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ বেঞ্চ ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানকে সমর্থন করে নিম্ন আদালতের হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত করেছে। এর ফলে সিরিয়া, হাইতি ও সংঘাতকবলিত অন্যান্য দেশের অস্থায়ী সুরক্ষা সুবিধাপ্রাপ্ত অভিবাসীদের আইনি অবস্থান আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ঘিরে রাজনৈতিক বিভাজনও তীব্র হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মনোনীত বিচারপতির নিয়োগ আটকে দিয়ে পরে নির্বাচনের ঠিক আগে ট্রাম্পের মনোনীত অ্যামি কোনি ব্যারেটকে দ্রুত নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে আদালতের বর্তমান রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা গড়ে তোলা হয়। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রকাশ্যে একাধিকবার আদালতের সমালোচনা করেছেন এবং নিজের মনোনীত বিচারপতিদের প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্যের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছেন, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস কার্যকরভাবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষমতার শূন্যস্থান অনেকটাই সুপ্রিম কোর্ট পূরণ করছে। একই সঙ্গে আদালতের সিদ্ধান্তগুলো প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ ও সম্প্রসারণ—উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করছে। ফলে ভবিষ্যতে যে দলই হোয়াইট হাউসে ক্ষমতায় আসুক না কেন, বর্তমান আদালতের রায়গুলো যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রব্যবস্থা, নির্বাহী ক্ষমতার পরিধি এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

সূত্র:সিএনএন

Advertisement
Advertisement
Advertisement