একসঙ্গে দুই দায়িত্বে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ইতিহাসে ফেরার ইঙ্গিত খলিলুর রহমানের
অনলাইন ডেস্ক:
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে এক ঐতিহাসিক গৌরব বয়ে এনেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। বিশ্বমঞ্চে দেশের এই অভাবনীয় সাফল্যের পর এবার সবার মনে কৌতূহল জেগেছে তাঁর আগামী দিনের ভূমিকা নিয়ে। তিনি কি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করে রাখবেন, নাকি জাতিসংঘের সদর দপ্তরেই ব্যস্ত থাকবেন? এই কোটি টাকার প্রশ্নের একটি স্পষ্ট ও চতুর ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি নিজেই। বৃহস্পতিবার ভোরে দেশে ফেরার পর বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক জমকালো সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন নবনির্বাচিত এই সভাপতি। সেখানে তাঁর দ্বৈত ভূমিকা পালনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা দেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে যখন সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হয় যে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন কি না, তখন স্বভাবসুলভ হাসিমুখে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জবাব দেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, তিনি কেন এই দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন এবং বিষয়টি নিয়ে এখনই এত তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই। নিজের বক্তব্যের সপক্ষে তিনি অতীতে ঘটে যাওয়া এক অবিস্মরণীয় নজিরের কথা মনে করিয়ে দেন। ১৯৮৬-৮৭ মেয়াদে বাংলাদেশ থেকে সর্বশেষ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। ড. খলিলুর রহমান জানান, সেই সময় তিনি হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর একান্ত সচিব হিসেবে অত্যন্ত কাছ থেকে পুরো প্রক্রিয়াটি দেখেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি নিশ্চিত করেন যে, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী পূর্ণকালীনভাবে একই সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ইউএনজিএ সভাপতির দুটি দায়িত্বই অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পালন করেছিলেন। ফলে ইতিহাসে যেহেতু এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে, তাই তাঁর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো কারণ নেই।
অবশ্য এই দ্বৈত দায়িত্ব পালনের ধরন নিয়ে এর আগেও কিছুটা ভিন্ন সুর শোনা গিয়েছিল তাঁর কণ্ঠে। গত ১৩ মে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত এক অনানুষ্ঠানিক সংলাপে যখন একই প্রশ্ন উঠেছিল, তখন তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে পূর্ণকালীন বিশ্বস্ততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি হয়তো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে সাময়িক ছুটি নিতে পারেন। সেই সময় তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছিলেন যে পদত্যাগই একমাত্র পথ নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তাঁকে খুব স্পষ্টভাবে আশ্বস্ত করেছেন যে প্রয়োজন হলে বিশ্বমঞ্চে পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁকে এক বছরের ছুটি দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর থেকেই মূলত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয় যে, ড. খলিলুর রহমান হয়তো বাংলাদেশের ইতিহাসে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সেই ঐতিহাসিক অধ্যায়েরই পুনরাবৃত্তি ঘটাতে যাচ্ছেন।
এই পুরো আলোচনার পেছনে রয়েছে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এক টানটান উত্তেজনার নির্বাচন। গোপন ব্যালটে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের এই মর্যাদাপূর্ণ নির্বাচনে বিশ্বনেতাদের ব্যাপক সমর্থন পান বাংলাদেশের এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক। মোট ১৯০টি ভোটের মধ্যে ড. খলিলুর রহমান পান ৯৯ ভোট, যেখানে তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী কাকৌরিস ৯১ ভোট পেয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর পরাজিত হন। অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ এই নির্বাচনে কোনো ভোট বাতিল হয়নি এবং কেউ ভোটদানে বিরতও থাকেনি, যা আন্তর্জাতিক মহলে ড. খলিলুর রহমানের গ্রহণযোগ্যতারই প্রমাণ দেয়। বিশ্বমঞ্চ জয় করে দেশের মাটিতে পা রাখার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সহকর্মী ও কর্মকর্তাদের উষ্ণ ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি। এখন দেখার বিষয়, অতীতের সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করে কীভাবে তিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি সচল রাখেন এবং বিশ্বসভার সর্বোচ্চ আসনটি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন।