ঈদের ছুটিতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় গলদ: প্রধানমন্ত্রীর ‘লাল টেলিফোন’ লাইনের তার চুরির চাঞ্চল্যকর ঘটনায় গ্রেপ্তার ২
অনলাইন ডেস্ক:
রাজধানীর সবচেয়ে সুরক্ষিত ও সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত সচিবালয়ের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘লাল টেলিফোন’ লাইনের তামার তার চুরির এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগের তার চুরির অভিযোগে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হলেন ২৬ বছর বয়সী রঞ্জন চন্দ্র এবং ৩২ বছর বয়সী রেজাকুল ইসলাম। এই চুরির ঘটনাটি সরকারি প্রশাসনের অন্দরমহলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে যেমন উন্মোচিত করেছে, তেমনি ভিভিআইপি যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক সাময়িক বিঘ্ন ও চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটির সুযোগ নিয়ে যখন সচিবালয় এলাকা প্রায় জনশূন্য ছিল, ঠিক তখনই এই চুরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। পুরোনো সচিবালয় ভবন-২ এবং নতুন ভবন-১-এর মধ্যবর্তী একটি গোপন ও সুরক্ষিত অংশ থেকে মাটির নিচে বা বিশেষ লাইনে থাকা মূল্যবান তামার তার কেটে নিয়ে যায় চোর চক্র। চুরিকৃত এই লাইনগুলো সাধারণ কোনো সংযোগ ছিল না; এগুলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি যোগাযোগের কাজে ব্যবহৃত ‘লাল টেলিফোন’ বা রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষার হটলাইনের সাথে সংযুক্ত ছিল। ঈদের ছুটির পর অফিস খোলার পর যখন এই গুরুত্বপূর্ণ লাইনে যোগাযোগে বিভ্রাট দেখা দেয়, তখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নজরে আসে বিষয়টি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সিটিটিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গ্রেপ্তারকৃত রঞ্জন চন্দ্র মূলত সচিবালয়েরই একজন আউটসোর্সিং কর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ভেতরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কোথায় কোন তার রয়েছে সে বিষয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় তিনি সহজেই এই অপরাধ ঘটাতে সক্ষম হন। রঞ্জন প্রায় আট কেজি ওজনের অত্যন্ত মূল্যবান রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের তামার তার চুরি করে তা ভাঙারি ব্যবসায়ী রেজাকুল ইসলামের কাছে বিক্রি করে দেন। পুলিশ কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এটি কেবল সাধারণ কোনো চুরি নয়, বরং এর পেছনে সচিবালয় এলাকায় সক্রিয় একটি সুসংগঠিত চক্র জড়িত থাকতে পারে। একজন সাধারণ পরিচ্ছন্নতা বা আউটসোর্সিং কর্মী কীভাবে রাষ্ট্রের এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্টে প্রবেশ করে তার কাটার সাহস পেলেন, তা খতিয়ে দেখছে প্রশাসন। একই সাথে এর পেছনে কোনো ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক বা গোয়েন্দা তথ্য ফাঁসের উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সাথে জড়িত এই ভয়াবহ চুরির ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। গত ১ জুন সরকারি টেলিকম সংস্থা বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) পুরো বিষয়টি বিস্তারিত উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ জমা দেয়। এরপরই ছায়া তদন্ত শুরু করে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সিটিটিসি এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে মূল অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এই ঘটনার পর সচিবালয়সহ রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ কেপিআই (কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন) এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে সাজানোর এবং আউটসোর্সিং কর্মীদের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাইয়ের বিষয়টি জোরালোভাবে আলোচনায় এসেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দায়েরের পর তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং এই চক্রের সাথে আর কারা জড়িত রয়েছে তা উদঘাটনে অভিযান অব্যাহত রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।