‘ভাই, এত ব্যস্ত হইয়েন না’: জোড়া দায়িত্বে রেকর্ড গড়তে চান নতুন জাতিসংঘ সভাপতি খলিলুর রহমান
অনলাইন ডেস্ক:
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর দেশজুড়ে প্রশংসার জোয়ারে ভাসছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। সাইপ্রাসের শক্তিশালী প্রার্থীকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করে বৈশ্বিক কূটনীতির এই শীর্ষ পদে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেছেন তিনি। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর আজ বৃহস্পতিবার সকালে নিউইয়র্ক থেকে সরাসরি রাজধানী ঢাকায় ফিরেছেন তিনি। বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মন্ত্রী। সেখানে তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও ব্যক্তিগত ছুটির বিষয়ে অবধারিত কিছু প্রশ্ন উঠে আসে। দীর্ঘ কূটনৈতিক পথচলার পর তিনি এখন কোনো ছুটি নেবেন কি না, সাংবাদিকদের এমন কৌতূহলী প্রশ্নের জবাবে চিরচেনা হাসিমুখে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ভাই, এত ব্যস্ত হইয়েন না।’
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই গৌরবময় অর্জনকে দেশের কোটি মানুষের প্রাপ্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই অসাধারণ বিজয় আসলে বাংলাদেশের বিজয়, এই বিজয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের ফসল। সরকারপ্রধানের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে খলিলুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রী যদি এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত না নিতেন এবং শুরু থেকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে, অবিচলভাবে ও কোনো রকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়া বাংলাদেশকে সমর্থন জুগিয়ে না যেতেন, তবে যে লক্ষ্য অর্জনে অন্তত ১০ বছর লেগে যাওয়ার কথা ছিল, তা মাত্র ১০ সপ্তাহের কঠোর পরিশ্রমে অতিক্রম করা সম্ভব হতো না।
কূটনৈতিক এই মহাবিজয়ের পেছনে টিমওয়ার্কের ওপর বিশেষ জোর দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তারা এই লক্ষ্য পূরণে দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করেছেন। একই সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার সমন্বিত প্রচেষ্টার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তাঁরা সবাই মিলে যে চমৎকার ‘টিম স্পিরিট’ বা দলগত সংহতি নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন, বিজয়ের পেছনে তার অবদান ছিল অপরিসীম। এই ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী অর্জনকে তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সমৃদ্ধির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন।
একপর্যায়ে একজন গণমাধ্যমকর্মী জানতে চান, জাতিসংঘের মতো একটি বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ পদের বিশাল দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি তিনি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবেন কি না, নাকি বড় কোনো ছুটিতে যাচ্ছেন। প্রশ্নের অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে কৌতুক করে মন্ত্রী বলেন, ‘চাকরি ছাড়ব কি না, এটাই তো?’ এরপর ছুটির প্রসঙ্গটি হেসেই উড়িয়ে দিয়ে তিনি সবাইকে আশ্বস্ত করেন যে, এত ব্যস্ত হওয়ার মতো বা উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। একই সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলানোর নজির দেশের ইতিহাসে নতুন নয় এবং এর একটি শক্তিশালী ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করে খলিলুর রহমান জানান, আজ থেকে ঠিক চার দশক আগে বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীও একইভাবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কাকতালীয়ভাবে, সেই গৌরবময় সময়ে খলিলুর রহমান নিজে প্রয়াত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং অত্যন্ত কাছ থেকে পুরো প্রক্রিয়াটি দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, তৎকালীন সময়ে কোনো ইন্টারনেট প্রযুক্তি ছিল না, ছিল না তাৎক্ষণিক যোগাযোগের আধুনিক মাধ্যম। সেই ইন্টারনেট-পূর্ব যুগেও যদি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পূর্ণকালীন ও সফলভাবে কাজ করতে পারেন, তবে বর্তমানের অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে নিরবচ্ছিন্নভাবে দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো আরও অনেক বেশি সহজ এবং এটি এখন অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়।
বিশ্বরাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট টেনে মন্ত্রী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচলিত কিছু বিভ্রান্তিও দূর করেন। জার্মানির এক সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উদাহরণ টেনে অনেকেই যে গুঞ্জন ছড়াচ্ছিলেন, তার জবাব দিয়ে তিনি বলেন, অনেকেই হয়তো মনে করছেন জার্মানির সেই নেতা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়ে জাতিসংঘের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, তিনি ছিলেন গ্রিন পার্টির শীর্ষ নেতা। সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল গ্রিন পার্টি পরাজিত হওয়ার ফলেই মূলত তাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়েছিল, জাতিসংঘের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য নয়। ফলে খলিলুর রহমান স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, উন্নত প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি তিনি স্বদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও সমান দক্ষতায় সামলে যাবেন।