আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নবজাতক মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসক, নার্স ও কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ; আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে সরকার

 প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৭:৩৬ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নবজাতক মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসক, নার্স ও কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ; আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে সরকার

ঢাকা, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ (৪ জুন ২০২৬) :

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, দায়িত্বরত চিকিৎসক ও সেবিকাদের দায়িত্ব পালনে গুরুতর অবহেলার বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে হাসপাতাল ভবনটির অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ঘাটতিকেও ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আজ সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন তদন্ত প্রতিবেদনের মূল তথ্য তুলে ধরেন।

মন্ত্রী জানান, গত ২৭ মে সকালে হাসপাতালের একটি পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সরকার তাৎক্ষণিকভাবে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কমিটি তাদের প্রতিবেদন দাখিল করেছে।

তদন্তে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট কক্ষটিতে দীর্ঘ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) বন্ধ ছিল এবং পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকায় অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়। একই সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়, যা নবজাতকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার কার্যকর কোনো মেডিক্যাল রেসপন্স ব্যবস্থা ছিল না। নবজাতকদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলেও দায়িত্বরত সেবিকারা প্রয়োজনীয় তৎপরতা দেখাননি এবং কোনো চিকিৎসককে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করেননি। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতেও গুরুতর দুর্বলতা পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে রোগীদের তদারকির জন্য নির্ধারিত কোনো চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণেরও ঘাটতি ছিল।

তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রায় ৯০০ বর্গফুট আয়তনের কক্ষটিতে রোগী, নবজাতক ও স্বজনসহ প্রায় ৫০ জন অবস্থান করছিলেন, যা অনুমোদিত ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। অতিরিক্ত জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো ধরনের অবহেলা বরদাশত করা হবে না। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আগামী রোববারের মধ্যে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে।”

তিনি আরও জানান, এ ঘটনার পর দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় পরিচালক, জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

নতুন হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে ভবনের উপযোগিতা যাচাই এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।

নবজাতকদের ময়নাতদন্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শোকাহত পরিবারের আবেগগত অবস্থার কারণে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। তবে তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণ বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিক ডা. শেখ মহিউদ্দিনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে। আগামী ৭ জুন বিকেল ৫টার মধ্যে এ বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে জবাবদিহিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের তদারকি ও আইনগত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement