মমতার সেই বিস্ফোরক মন্তব্য ও হাদি হত্যা: নেপথ্যের চক্রান্ত কি এবার সামনে আসছে?
বিশেষ প্রতিবেদক: ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এর নেপথ্যের রহস্য উদঘাটন নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। তবে সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বিস্ফোরক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে সারা দেশে। কলকাতায় এক জনসভায় মমতা দাবি করেন, বাংলাদেশের একটি শীর্ষ হত্যা মামলার আসামি মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের পর তাদের পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের স্বার্থে এ বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে মুখ খুলতে নিষেধ করেছিলেন। মমতার মুখ থেকে ‘বাংলাদেশে কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন, সবটাই জানি’—এমন মন্তব্য আসার পরপরই ঢাকার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই দাবি করা হচ্ছিল যে, দেশীয় কিছু চক্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ভারতীয় আধিপত্যবাদ শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা করেছে। মমতার এই সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই দাবিকে আরও জোরালো করে তুলেছে এবং এটি ইঙ্গিত করে যে, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে এমন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সংস্থার সম্পৃক্ততা রয়েছে, যার আসল পরিচয় প্রকাশ পেলে গোটা দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।
সংগঠনটির দাবি, হাদিকে কেবল তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে হত্যা করা হয়েছে বলে ধরে নিলে বড় ভুল হবে। এই হত্যাকাণ্ডে ভারতের গভীর কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা এখন একটি বড় প্রশ্ন। এর সপক্ষে যুক্তি হিসেবে তারা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের পরপরই সীমান্ত সিল করার আইনি বাধ্যবাধকতা ও নির্দেশনা থাকলেও, তৎকালীন সরকার রহস্যজনকভাবে তা করতে ব্যর্থ হয়। যার সুযোগ নিয়ে খুনিরা সহজেই দেশ ছাড়তে সক্ষম হয়। চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করলেও বর্তমানে এর অধিকতর তদন্তভার রয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের হাতে। মমতার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, এই রাজনৈতিক বক্তব্য তদন্তের জন্য কতটা প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখবে সিআইডি। সিআইডি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান এবং নতুন যেকোনো তথ্য বা রাজনৈতিক সূত্র সামনে এলে তা আমলে নিয়ে আরও বিস্তৃত আকারে তদন্ত চালানো হবে।
সিআইডির সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, হাদি হত্যাকাণ্ডের পর মূল অভিযুক্তরা ঢাকার সীমানা পেরিয়ে মেঘালয় সীমান্ত হয়ে কলকাতায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের স্পেশাল টাস্কফোর্স তাদের গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে কলকাতায় বন্দি থাকা এই তিন আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের অনেক অজানা তথ্য এবং মাস্টারমাইন্ডদের পরিচয় উন্মোচন করা সম্ভব হবে। তাদের ফিরিয়ে আনতে পুলিশের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যে যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রয়োজনে এ বিষয়ে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আবারও চিঠি পাঠানো হবে বলে সিআইডি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও পূর্ব ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি। এজন্য প্রায় এক বছর আগে থেকে তিনি এলাকায় একটি অভিনব ও ব্যাপক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছিলেন। এই রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার মাঝেই গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তরা শরিফ ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি গুলি চালায়। মাথায় গুরুতর গুলিবিদ্ধ হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে তিনি মারা যান। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন, যা পরবর্তীতে হাদির মৃত্যুর পর নিয়মিত হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি মামলার প্রথম তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৭ জনের বিরুদ্ধে একটি চার্জশিট দাখিল করেন। ডিবির পক্ষ থেকে সে সময় বলা হয়েছিল, মূলত ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ থেকেই হাদিকে হত্যার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা হয়। চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ এবং তার অন্যতম সহযোগী আলমগীর হোসেনসহ রাজধানীর মিরপুরের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, ফিলিপ স্নাল, মুক্তি আক্তার এবং জেসমিন আক্তারের নাম রয়েছে। তবে ডিবির দেওয়া এই চার্জশিটে অসন্তোষ প্রকাশ করে গত ১৫ জানুয়ারি আদালতে নারাজি আবেদন করেন মামলার বাদী। আদালত সেই আবেদনটি গ্রহণ করে অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তরের আদেশ দেন। বর্তমানে চার্জশিটভুক্ত ১৭ আসামির মধ্যে ১১ জন দেশের বিভিন্ন কারাগারে আছেন এবং বাকি ৬ জন পলাতক রয়েছেন।
তৎকালীন তদন্তকারী সংস্থা ডিবির তথ্য অনুযায়ী, শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীর। ঘটনার দিন তারা মোটরসাইকেলে করে পেছন থেকে এসে রিকশায় বসা হাদিকে গুলি করেন। চালকের আসনে ছিলেন আলমগীর হোসেন আর পেছনে বসে থাকা শ্যুটার ফয়সাল গুলি চালান। তদন্তে আরও দেখা যায়, মূল শ্যুটার ফয়সাল ও তার সহযোগীদের ঢাকা থেকে পলায়নে সার্বিক সহায়তাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখেন সাবেক আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী। এছাড়া মূল আসামিদের সীমান্ত পার করে দিতে ফয়সালের পরিবারের সদস্যসহ আরও এক ডজন ব্যক্তি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। ডিবির পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল যে, আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং ভুক্তভোগীর পূর্ববর্তী বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে এটা স্পষ্ট যে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় এই ন্যাক্কারজনক হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছিল।
এদিকে ওসমান হাদি হত্যা মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ এ পর্যন্ত ১৪ বার পিছিয়েছে। সর্বশেষ নির্ধারিত তারিখেও সিআইডি প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় আদালত আগামী ৭ জুন নতুন তারিখ ধার্য করেছেন। অধিকতর তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে সিআইডির মিডিয়া শাখা জানিয়েছে, চার্জশিটের বাইরে তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নতুন করে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা ইতোমধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এর বাইরে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল সরবরাহকারীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে এবং তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। সিআইডি আরও জানায়, তাদের দিক থেকে তদন্ত কাজ প্রায় শেষের দিকে হলেও মামলার মূল আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে পুরো চক্রান্তের শেকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব হবে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত এবং ২০১৬ সালে সংশোধিত বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ যেমন হত্যার আসামিদের প্রত্যর্পণ বাধ্যতামূলক। এই আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হাদির হত্যাকারীদের ফেরত আনতে ভারত সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে কাজ চলছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেখানকার রাজ্য নেতাদের কোনো বক্তব্যে বাংলাদেশের সরাসরি মন্তব্য করা উচিত নয় বলে মনে করলেও, আসামিদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অধীন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সকল আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে এবং প্রতিবেশী দেশ চাইলে খুব দ্রুতই এই বন্দি বিনিময় সম্ভব, যা সম্পন্ন হলে চলতি মাসেই হাদি হত্যার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার, খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ঘটনার পেছনের দেশি-বিদেশি চক্রান্ত উদঘাটনের দাবিতে মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ কর্মসূচির মাধ্যমে আবারও রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ।