‘দলই আমার শেষ ঠিকানা, শান্ত থাকুন’ পদত্যাগের পর আবেগঘন ফেসবুক বার্তায় পার্বত্যবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান দীপেন দেওয়ানের

 প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৮:৪৪ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

‘দলই আমার শেষ ঠিকানা, শান্ত থাকুন’  পদত্যাগের পর আবেগঘন ফেসবুক বার্তায় পার্বত্যবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান দীপেন দেওয়ানের

প্রতিবেদক, রাঙ্গামাটি

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করার মাত্র দুই দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক দীর্ঘ ও আবেগঘন বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছেন সাবেক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। বুধবার (৩ জুন) রাতে দেওয়া এই ফেসবুক পোস্টে তিনি রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের সর্বস্তরের জনগণকে যেকোনো পরিস্থিতিতে শান্ত ও ধৈর্যশীল থাকার জোরালো অনুরোধ জানিয়েছেন। পদত্যাগের পর থেকে পাহাড়ে তাঁর সমর্থক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করতেই মূলত তিনি এই বার্তা দিয়েছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।


পোস্টের শুরুতেই পার্বত্য অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দীপেন দেওয়ান সব সম্প্রদায়ের মানুষের উদ্দেশে ঐতিহ্যবাহী অভিবাদন জানান। তিনি লিখেন, ‘প্রিয় পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণ, আসসালামালাইকুম, ঝু ঝু, নমস্কার, কুলুংকা, রিকোবয়া।’ এই সম্বোধনের মাধ্যমে তিনি শুরুতেই পাহাড় ও সমতলের মানুষের মধ্যে একতার সুর বেঁধে দেন।

পদত্যাগের পর রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের মানুষের প্রতিক্রিয়া তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে উল্লেখ করে সাবেক এই মন্ত্রী জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে তাঁর পদত্যাগকে কেন্দ্র করে তিন জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে যে আবেগ, উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি গভীরভাবে অবগত রয়েছেন।

উত্তেজনা পরিহার করে সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে দীপেন দেওয়ান বলেন, তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল পাহাড়ি, বাঙালি এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের ভাই-বোনদের প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানাচ্ছেন যেন সবাই শান্ত থাকেন, ধৈর্য ধারণ করেন এবং আইন-শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় রাখেন। কোনো ধরনের উসকানি, বিভ্রান্তি বা সংঘাতের পথে না গিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য তিনি সবার প্রতি অনুরোধ জানান।

পার্বত্য অঞ্চলের ভবিষ্যৎ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, তিনি বিশ্বাস করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম সবার। এই অঞ্চলের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও শান্তি রক্ষার দায়িত্বও সবার। পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সকল জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থা আরও সুদৃঢ় হোক—এটাই তাঁর পরম প্রত্যাশা।

একই সাথে এই বার্তার মাধ্যমে তিনি নিজের পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং দলের প্রতি তাঁর অবিচল আনুগত্যের বিষয়টি নতুন করে স্পষ্ট করেছেন। সাবেক মন্ত্রী অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে স্মরণ করেন যে, তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একজন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পিতার সেই আদর্শ, দেশপ্রেম ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মূল প্রেরণা। তিনি আরও জানান, দেশনেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্নেহ, দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্বে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগদান করেছিলেন। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত তিনি বিএনপির একজন নিবেদিত কর্মী হিসেবে কাজ করে আসছেন এবং অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলই তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের একমাত্র ঠিকানা। জীবনের অবশিষ্ট সময়ও তিনি এই প্রিয় দল, এর আদর্শ এবং দেশের জনগণের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে যেতে চান। ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক যেকোনো পরিস্থিতিতেই দলের প্রতি তাঁর আনুগত্য ও অঙ্গীকার অটুট থাকবে এবং এই দল তিনি কখনো ত্যাগ করবেন না।

নেতৃত্বের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রেখে এবং পার্বত্যবাসীর কল্যাণকে সবার ওপরে স্থান দিয়ে দীপেন দেওয়ান আরও যোগ করেন, ব্যক্তি নয়, জনগণের কল্যাণই সবচেয়ে বড় বিষয়। তাই তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জনগণের কাছে আবারও আহ্বান জানান যেন সবাই শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকেন। সমাজে মত-পার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু বিভেদ নয়, আবার প্রতিযোগিতা থাকতে পারে কিন্তু সংঘাত নয়। তাঁর একান্ত কামনা, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার পাহাড়ি-বাঙালি সকল সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করুক, উন্নয়নের সুফল ভোগ করুক এবং এই অঞ্চল সম্প্রীতি, স্থিতিশীলতা ও শান্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে গড়ে উঠুক।

পোস্টের শেষাংশে ভবিষ্যতের রাজনীতি ও দেশের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে নিজের চূড়ান্ত অবস্থানের কথা জানিয়ে দীপেন দেওয়ান লেখেন, পরিশেষে তিনি বলতে চান—মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি তিনি পূর্ণ আস্থাশীল এবং নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এগিয়ে যেতে চান। তিনি আবারো দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-ই তাঁর শেষ ঠিকানা। তাঁর এই বার্তার পর পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন সমীকরণ ও স্বস্তি ফিরে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement