সংবাদ শিরোনাম

চর্চাকেন্দ্রে হামলা: মুন্সীগঞ্জে প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিককে কুপিয়ে জখম, বিএনপি নেতা আটক

 প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ০৮:০৯ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

চর্চাকেন্দ্রে হামলা: মুন্সীগঞ্জে প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিককে কুপিয়ে জখম, বিএনপি নেতা আটক

প্রতিবেদক,মুন্সীগঞ্জ:

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে একটি লালন চর্চাকেন্দ্রের জমি ও সীমানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছেন দৈনিক প্রথম আলোর ফিচার বিভাগের প্রধান ফটোসাংবাদিক কবির হোসেন এবং তার ছোট ভাই তকবির হোসেন। গত মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার লতব্দি ইউনিয়নের দোসরপাড়া এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত কবির হোসেনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর মাদবরকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দোসরপাড়া এলাকায় সাংবাদিক কবির হোসেনের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে একটি লালন চর্চাকেন্দ্র পরিচালনা করে আসছিল। এই চর্চাকেন্দ্রের জমি ও এর চারপাশের সীমানা নিয়ে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তাদের বিরোধ চলছিল। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এই বিরোধ আরও উগ্র রূপ নেয়। অভিযোগ উঠেছে, সরকার পরিবর্তনের সুবাদে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চর্চাকেন্দ্রটি জোরপূর্বক দখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছিল। কবির হোসেন ও তার পরিবার এই অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিলে তাদের বিভিন্ন সময়ে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার দুপুরে চর্চাকেন্দ্রের সীমানা প্রাচীর ও বেড়া মেরামতের কাজ করছিলেন কবির হোসেন ও তার স্বজনরা। এ সময় লতব্দি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর মাদবরের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে আচমকা সেখানে চড়াও হয়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হামলাকারীরা কবির হোসেনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাকে লক্ষ্য করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। তাকে বাঁচাতে ছোট ভাই তকবির হোসেন এগিয়ে এলে তাকেও নির্মমভাবে পিটিয়ে জখম করা হয়। দুই ভাইয়ের চিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে এলে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

রক্তাক্ত অবস্থায় দুই ভাইকে উদ্ধার করে প্রথমে সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. জাহানারা আক্তার জানান, কবির হোসেনের মাথায় ধারালো অস্ত্রের গভীর আঘাত রয়েছে এবং হামলায় তার দাঁত ভেঙে গেছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

আহতদের স্বজনরা সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করেছেন যে, জাহাঙ্গীর মাদবরের সরাসরি নির্দেশ ও উপস্থিতিতেই এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় জাহাঙ্গীর মাদবরের ছেলে তৌহিদ মাদবর, জাহেদ মাদবর, আলাউদ্দিন মাদবর, শাহরিয়ার মাদবর, সংগ্রাম, সাহিল ও আহম্মদ মাদবরসহ আরও ১০-১২ জন অংশ নেয়। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলে পুলিশ দ্রুত অভিযানে নামে। সিরাজদিখান থানা পুলিশ ঘটনার পরপরই অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর মাদবরকে আটক করতে সক্ষম হয়।

সিরাজদিখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল হান্নান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হামলার খবর পাওয়ামাত্রই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে নিয়মিত মামলা হিসেবে রুজু করা হয়। এজাহারভুক্ত বাকি আসামিদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে এবং অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

এদিকে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। পেশাদার একজন সাংবাদিকদের ওপর এমন নৃশংস হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যদিকে, দলীয় নেতার এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে স্থানীয় বিএনপি নেতৃত্ব। সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম হায়দার আলী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, দলের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে কাউকেই ব্যক্তিগত অপরাধ বা জমি দখলের মতো অপকর্ম করতে দেওয়া হবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় নেই এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement