সংবাদ শিরোনাম

মাজারের দিঘি থেকে সরছে ঐতিহ্যবাহী কুমির: আতঙ্ক কাটিয়ে স্বস্তির খোঁজে বাগেরহাট

 প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ০৭:৫৬ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

মাজারের দিঘি থেকে সরছে ঐতিহ্যবাহী কুমির: আতঙ্ক কাটিয়ে স্বস্তির খোঁজে বাগেরহাট

অনলাইন ডেস্ক:

হজরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মাজার দিঘির শান্ত জলে এখন কেবলই এক অজানা আতঙ্ক। শত শত বছরের ঐতিহ্য আর লোকজ বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে থাকা দিঘির কুমিরটি এবার জননিরাপত্তার স্বার্থে তার চিরচেনা আবাসস্থল হারাতে চলেছে। সম্প্রতি দিঘির ঘাটে ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনা পুরো এলাকায় তীব্র ভীতি ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিঘিতে থাকা কুমিরটিকে সাময়িকভাবে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।

ঘটনার সূত্রপাত কিছুদিন আগে, যখন মাজারের দিঘিতে পরিবারের সাথে এসে অসাবধানতাবশত গোসল করতে নামে ফাতেমা আক্তার নামের এক শিশু। হঠাৎ করেই জলের নিচ থেকে ধেয়ে আসা কুমিরটির অতর্কিত হামলার শিকার হয় সে। এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় বাসিন্দা এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থীদের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন যেখানে হাজারো মানুষের আনাগোনা থাকত, সেখানে মাজার প্রাঙ্গণে নেমে আসে এক সুনসান নীরবতা। দিঘির ঘাটে নামতে ভয় পাচ্ছিলেন সবাই। চারিদিক থেকে দাবি উঠতে থাকে দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের নিরাপত্তা জোরদার করার।

জনগণের এই যৌক্তিক উদ্বেগ ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মঙ্গলবার রাতে বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে একটি জরুরি সভা আহ্বান করা হয়। জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মাজার কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ আলোচনার পর সবার সম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় যে, মানুষের জীবন রক্ষার্থে কুমিরটিকে আপাতত দিঘি থেকে নিরাপদ কোনো স্থানে স্থানান্তর করা হবে। জেলা প্রশাসক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ঐতিহ্য রক্ষা করা জরুরি হলেও মানুষের জীবনের নিরাপত্তা তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে শত শত কেজি ওজনের একটি বন্য কুমিরকে বিশাল এই দিঘি থেকে অক্ষত অবস্থায় ধরা এবং তা নিরাপদ দূরত্বে পরিবহন করা বেশ জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। আর এই কারিগরি দিকটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বাগেরহাট পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, কুমিরটি স্থানান্তরের প্রাথমিক প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। এই অভিযানের অংশ হিসেবে খুলনা থেকে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ ট্র্যাকারদের একটি বিশেষ দল বুধবার বাগেরহাটে এসে পৌঁছাবে। বিশেষজ্ঞরা প্রথমে দিঘির চারপাশ ঘুরে কুমিরটির বর্তমান অবস্থান, চলাচলের পথ এবং আচরণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। এরপর তারা কুমিরটিকে কোনো রকম আঘাত না দিয়ে ফাঁদ বা জালের সাহায্যে ধরার কৌশল এবং স্থানান্তরের সময় নির্ধারণসহ সব ধরনের কারিগরি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করবেন।

খানজাহান আলীর মাজারের দিঘি এবং এর কুমির—দুটিই বাগেরহাটের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। লোকশ্রুতি আছে, হযরত খানজাহান আলী (রহ.) এই দিঘি খনন করার পর ‘কালাপাহাড়’ ও ‘ধলাপাহাড়’ নামে দুটি কুমির এখানে ছেড়েছিলেন। সেই থেকে বংশপরম্পরায় কুমিরেরা এই দিঘিতেই বাস করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কুমিরের আচরণে এক ধরণের হিংস্রতা ও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছিল, যা সর্বশেষ এই হামলার মধ্য দিয়ে মারাত্মক রূপ নেয়। কুমিরটি সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তে যেমন মাজারের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যে সাময়িক এক শূন্যতা তৈরি হবে, তেমনি স্থানীয়দের মনে ফিরে আসবে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি ও নিরাপত্তার অনুভূতি। এখন সবার চোখ বিশেষজ্ঞদের অভিযানের দিকে, যেন কোনো রকম ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই কুমিরটিকে তার নতুন নিরাপদ আবাসে পৌঁছে দেওয়া যায়।

Advertisement
Advertisement
Advertisement