সংবাদ শিরোনাম

সীমান্তে কৌতূহলের মর্মান্তিক পরিণতি: মিয়ানমারের পরিত্যক্ত মর্টার শেল বিস্ফোরণে প্রাণ গেল তঞ্চঙ্গ্যা কিশোরের

 প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ০৭:৫৪ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

সীমান্তে কৌতূহলের মর্মান্তিক পরিণতি: মিয়ানমারের পরিত্যক্ত মর্টার শেল বিস্ফোরণে প্রাণ গেল তঞ্চঙ্গ্যা কিশোরের

নাইক্ষ্যংছড়ি (বান্দরবান) , প্রতিবেদক:

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির দুর্গম সীমান্ত জুড়ে এখন শুধু স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ আর আহাজারি। পাহাড়ি জনপদের যে চঞ্চল কিশোরটি সকালের আলোয় মেতে উঠেছিল চেনা প্রকৃতির মাঝে, দুপুরের এক নিমেষের শব্দে তার সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে পড়ে থাকা একটি পরিত্যক্ত অবিস্ফোরিত মর্টার শেল নিয়ে খেলার ছলে পাথর দিয়ে আঘাত করতেই বিকট শব্দে ঘটে বিস্ফোরণ। আর তাতেই ঘটনাস্থলে প্রাণ হারিয়েছে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের ১২ বছর বয়সী কিশোর সতনাইং। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বালুখালী এলাকার বাইশফাড়ি পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা কিংলার ছেলে সে। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের আলোকেই নিভিয়ে দেয়নি, বরং পুরো সীমান্তজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে এক অজানা আতঙ্ক ও গভীর শোকের ছায়া।

মঙ্গলবার দুপুরের তপ্ত রোদে যখন পাহাড়ের শান্ত পরিবেশ চেনা ছন্দে বইছিল, ঠিক তখনই বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের শূন্যরেখা সংলগ্ন এলাকা এক ভয়াবহ শব্দে কেঁপে ওঠে। সীমান্ত পিলার-৩৯ এর উত্তর-পূর্ব দিকে এবং শূন্যলাইন থেকে প্রায় ২০ গজ মিয়ানমারের অভ্যন্তরে অবস্থিত আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত মুরিঙ্গাঝিরি এলাকায় এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। এলাকাটি কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি) এর অধীনস্থ তুইঙ্গাঝিরি বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্তের একেবারে কোল ঘেঁষে অবস্থিত। কিশোর সতনাইং সীমান্তসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় চলাচলের সময় মাটির ওপর একটি ভারী ও অচেনা ধাতব বস্তু পড়ে থাকতে দেখে। অবুঝ ও কৌতূহলী মন নিয়ে সেটির কাছে এগিয়ে যায় সে। বস্তুটির ভেতরে যে লুকিয়ে ছিল এক মরণঘাতী দানব, তা হয়তো তার জানা ছিল না। কৌতূহলবশত অবহেলায় হাতের কাছে থাকা একটি শক্ত পাথর দিয়ে সে মর্টার শেলটির ওপর আঘাত করে। মুহূর্তের মধ্যে এক প্রচণ্ড অগ্নিগোলক আর বিকট শব্দে চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, মুহূর্তেই ক্ষতবিক্ষত হয়ে কিশোর সতনাইং ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জান্তা বাহিনী ও সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান তীব্র সংঘাতের কারণে এই সীমান্ত অঞ্চলগুলো এখন এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দুই পক্ষের ছোড়া বহু মরণঘাতী গোলাবারুদ ও মর্টার শেল লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বা অবিস্ফোরিত অবস্থায় যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। পাহাড়ি ও সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ মূলত জুম চাষ, লাকড়ি সংগ্রহ ও বাঁশ কাটার মতো কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। জীবনের তাগিদে তাদের প্রায়শই অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি বা শূন্যরেখা পার হয়ে যাতায়াত করতে হয়। এই সংঘাতপূর্ণ দীর্ঘস্থায়ী পরিস্থিতির কারণে সীমান্তবর্তী জনপদে এখন অবিস্ফোরিত ল্যান্ডমাইন ও মর্টার শেলের মতো মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধাস্ত্রের স্তূপ জমে উঠেছে, যা স্থানীয় সাধারণ মানুষ এবং বিশেষ করে অবুঝ শিশু-কিশোরদের জীবনের জন্য এক স্থায়ী ও চরম মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়েছে।

এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বাইশফাড়ি পশ্চিম পাড়াসহ পুরো নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে নেমে এসেছে স্তব্ধতা। নিহতের বাড়িতে স্বজনদের বুকফাটা কান্না আর আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে, যেখানে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না প্রতিবেশীরা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন এবং সীমান্ত এলাকায় সাধারণ মানুষের সুরক্ষার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি) এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম কায়রুল আলম এই বেদনাদায়ক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা একটি অবিস্ফোরিত মর্টার শেল নিয়ে অসচেতনভাবে নাড়াচাড়া করার সময়ই এই ভয়াবহ বিস্ফোরণটি ঘটে। এই ঘটনার পর সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা ও নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সীমান্তের জিরো লাইনের কাছাকাছি না যাওয়ার জন্য এবং যেকোনো অচেনা বা সন্দেহজনক বস্তু দেখলে তা স্পর্শ না করে দ্রুত প্রশাসনকে জানানোর জন্য বিশেষভাবে সতর্ক করা হচ্ছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement