সংবাদ শিরোনাম

বিদায় রাজপথের ‘কিংবদন্তি’, শেষ শ্রদ্ধায় সিক্ত হতে ভোলায় তোফায়েল আহমেদ

 প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৩:০৩ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

বিদায় রাজপথের ‘কিংবদন্তি’, শেষ শ্রদ্ধায় সিক্ত হতে ভোলায় তোফায়েল আহমেদ

অনলাইন ডেস্ক:

একটি যুগের অবসান ঘটিয়ে চিরবিদায় নিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম মহানায়ক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। সোমবার বিকেলে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮২ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এক অভিভাবকহীন শূন্যতায় নিমজ্জিত হলো, যার রেশ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ছাড়িয়ে তাঁর প্রিয় জন্মভূমি ভোলার প্রতিটি ধূলিকণায় আছড়ে পড়েছে। সোমবার সন্ধ্যার পর ধানমণ্ডির তাকওয়া মসজিদে প্রথম জানাজা শেষে আজ মঙ্গলবার দুপুরে তাঁর মরদেহ শেষবারের মতো নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাঁর চেনা আঙিনায়, তাঁর প্রাণের শহর ভোলায়।

ঢাকা থেকে একটি বিশেষ হেলিকপ্টারযোগে দুপুর ১টা ৩৮ মিনিটের দিকে ভোলার বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন হেলিপ্যাডে তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয়। নিথর দেহে প্রিয় নেতার ফেরার প্রতীক্ষায় সকাল থেকেই হেলিপ্যাড ও এর আশপাশের এলাকায় জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। হেলিকপ্টারটি যখন মাটিতে স্পর্শ করে, তখন সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বর্ষীয়ান এই নেতার মরদেহের সঙ্গে ঢাকা থেকে এসেছেন তাঁর একমাত্র মেয়ে তাছলিমা আহমেদ জামান মুন্নি এবং জামাতা ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন। হেলিকপ্টারটি অবতরণের পরপরই দলীয় নেতাকর্মী, আত্মীয়-স্বজন ও অগণিত শুভানুধ্যায়ী অশ্রুসজল চোখে কফিনটি ঘিরে ধরেন। চোখের জলে প্রিয় নেতাকে বরণ করে নেন তারা, যিনি দশকের পর দশক ধরে আগলে রেখেছিলেন এই দ্বীপজেলাকে।

হেলিপ্যাড থেকে তোফায়েল আহমেদের মরদেহ বহনকারী কফিনটি একটি সুসজ্জিত লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যে মাঠটিতে তিনি অসংখ্যবার বজ্রকণ্ঠে ভাষণ দিয়েছেন, সেই মাঠেই আজ দুপুর ২টায় তাঁর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নিতে জেলার দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের ঢল নামে। প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের নিরাপত্তা এবং সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুরো জেলাজুড়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি ও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা লক্ষ্য করা গেছে।

ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে তাঁর শিকড়ের টানে—গ্রামের বাড়ি দক্ষিণ দীঘলদি ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে। সেখানে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত জন্মস্থানে আরেকটি জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর এই মাঠ কাঁপানো বীর, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান সাক্ষী চিরতরে ঘুমিয়ে পড়বেন তাঁর বাবা-মায়ের পাশে, পারিবারিক কবরস্থানের শান্ত ছায়ায়।

১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক, যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন, তাঁর এই মহাপ্রয়াণে গোটা জেলাজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। ভোলার প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি রাজনৈতিক কার্যালয়ে এবং সাধারণ মানুষের মুখে মুখে আজ শুধুই তাঁর অবদানের কথা। দল-মত নির্বিশেষে সকলেই স্বীকার করছেন, তোফায়েল আহমেদের চলে যাওয়া শুধু ভোলার জন্য নয়, সমগ্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি আর কখনো জনসভায় মাইক্রোফোন হাতে হুংকার দেবেন না, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ আর স্মৃতি ভোলার মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে অনন্তকাল।

Advertisement
Advertisement
Advertisement