উত্থান-পতনের দোলাচলে বিশ্ব তেলের বাজার: আবর্তে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক ও হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ
অনলাইন ডেস্ক:
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির উত্তাপ আর কূটনীতির মারপ্যাঁচে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যেন এক অস্থির ঘূর্ণিপাকে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আগের দিনের বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলে আজ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে। তবে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে ভাবলে ভুল হবে, বরং বিনিয়োগকারীরা এখনো চরম সতর্ক অবস্থানে থেকে প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করছেন। মঙ্গলবার গ্রিনউইচ সময় সকাল ৪টা ৩৪ মিনিটে বিশ্ববাজারের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৫ সেন্ট বা ০.৭৯ শতাংশ কমে ৯৪.২৩ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই তেলের দামও ৮৫ সেন্ট বা ০.৯২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৯১.৩১ ডলারে দাঁড়ায়। অথচ এর মাত্র এক দিন আগে, অর্থাৎ সোমবার, উভয় ধরনের তেলের দামই এক লাফে ৫ শতাংশের বেশি বেড়ে গিয়েছিল। এর বিপরীতে অবশ্য পুরো মে মাসজুড়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তির আশায় বুক বেঁধেছিলেন ব্যবসায়ীরা, যার ফলে ওই মাসে তেলের দাম ১৬ শতাংশেরও বেশি কমেছিল। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য চুক্তির আশায় বাজার এই অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠতে চাইলেও মাঠপর্যায়ে এখন পর্যন্ত এমন কোনো বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না, যা তেলের বাজারকে স্থায়ীভাবে স্বস্তি দিতে পারে।
এই অস্থিরতার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং শীর্ষ নেতৃত্বের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। সোমবার এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প প্রথমে বলেছিলেন যে আলোচনা শেষ হয়ে গেলেও তার কোনো আপত্তি নেই, যা বাজারে তাৎক্ষণিক উদ্বেগের জন্ম দেয়। তবে এর কিছুক্ষণ পরেই আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি সুর নরম করে জানান যে ইরানের সঙ্গে আলোচনা এখনো অব্যাহত রয়েছে। পরবর্তীতে অন্য একটি সাক্ষাৎকারে তিনি কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধবিরতি বাড়ানো এবং অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি বড় ধরনের চুক্তি হতে পারে বলে তিনি আশা করছেন। শীর্ষ নেতৃত্বের এমন নাটকীয় বিবৃতির জেরে বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বর্তমানে পুরো জ্বালানি বিশ্বের নজর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় বাস্তব কোনো অগ্রগতি হচ্ছে নাকি নতুন কোনো কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে, তার ওপর। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অবস্থান এবং ওই জলপথ দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের বাস্তব পরিস্থিতির ওপরই তেলের দামে বর্তমানে যুক্ত হওয়া ঝুঁকিজনিত অতিরিক্ত মূল্য বা 'রিস্ক প্রিমিয়াম' টিকে থাকা না-থাকা নির্ভর করছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতিও এই সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সোমবার লেবানন একটি আংশিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে, যার আওতায় হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলের মতে, এটি ইরানকে ঘিরে তৈরি হওয়া বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের ক্ষেত্রে একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিনিয়ত যেভাবে পরস্পরবিরোধী ও নতুন নতুন খবর আসছে, তাতে শান্তিচুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত ও স্পষ্ট কোনো অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত তেলের বাজারে এই অস্থিরতা চলতেই থাকবে। উল্লেখ্য, এই অঞ্চলে পুরোদমে সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরান কার্যত উপসাগরীয় এলাকায় অ-ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, যা বিশ্ববাজারে সামগ্রিকভাবে তেলের দামকে এক ধাক্কায় ৫০ শতাংশের বেশি বাড়িয়ে দিয়েছিল। সরবরাহ ব্যবস্থার এই অচলাবস্থার কারণে বিশ্বজুড়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতিকে মুদ্রাস্ফীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহের পথ বদলে যাচ্ছে এবং এর সরাসরি সুফল পাচ্ছে মার্কিন জ্বালানি খাত। পারস্য উপসাগরের বিকল্প উৎস হিসেবে এশিয়া ও ইউরোপের বড় বড় শোধনাগারগুলোতে এখন যুক্তরাষ্ট্রের তেলের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলশ্রুতিতে সদ্য সমাপ্ত মে মাসে দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানি দৈনিক ৫৬ লাখ ব্যারেলের এক ঐতিহাসিক রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। তবে এই বিপুল পরিমাণ রপ্তানির কারণে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। একটি প্রাথমিক জরিপে দেখা গেছে, মে মাসের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ৩৬ লাখ ব্যারেল কমে গেছে, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশটির স্থানীয় বাজারে। একই সঙ্গে আসন্ন দিনগুলোতে সেখানে উৎপাদন সচল রাখা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ডিজেল ও পেট্রোলের মজুতও আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই অভ্যন্তরীণ ঘাটতি মার্কিন নীতি নির্ধারকদের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে শান্তি আলোচনার টেবিলকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশ্বের সামগ্রিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য সচল রাখতে এই সংকটের দ্রুত সমাধান চান বৈশ্বিক ব্যবসায়ীরা। সম্প্রতি গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিপিং খাতের কর্মকর্তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যদি কোনো শান্তিচুক্তি হয়, তবে আন্তর্জাতিক জলসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেই চুক্তিতে অবশ্যই স্পষ্ট ও অদ্ব্যর্থহীন নির্দেশনা থাকতে হবে। অন্যথায় কেবল মৌখিক আশ্বাসে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রে নামবে না। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলো সম্পূর্ণ নিরাপদে ও স্বাভাবিকভাবে পুনরায় চলাচল শুরু করতে পারে, তা নিশ্চিত করাই এখন বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কূটনীতিক ও বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সমুদ্রসীমার বাস্তব নিরাপত্তাই শেষ পর্যন্ত ঠিক করবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কোন অভিমুখে যাবে।