রাশিয়ায় উচ্চ বেতনের ফাঁদ: স্বপ্নযাত্রার নামে প্রতারণা, তিন এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল
অনলাইন ডেস্ক: রাশিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরি আর বিলাসবহুল জীবনের রঙিন স্বপ্ন বুনেছিলেন ৩০ জন বাংলাদেশি যুবক। উন্নত ভবিষ্যতের আশায় বুক বেঁধে, জমিজমা কিংবা শেষ সম্বল বিক্রি করে টাকা তুলে দিয়েছিলেন রিক্রুটিং এজেন্সির হাতে। কিন্তু সুদূর মস্কোয় পা রাখার পরই ভেঙে চুরমার হয়ে যায় সেই স্বপ্নের প্রাসাদ। সেখানে গিয়ে তারা মুখোমুখি হন এক চরম অনিশ্চয়তা ও মানবেতর পরিস্থিতির। দেশের যুবকদের জীবনকে এমন ঝুঁকিতে ফেলে প্রতারণা করার অভিযোগে এবার কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সরাসরি নির্দেশে অভিযুক্ত তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল এবং তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, লাইসেন্স হারানো এই তিন বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান হলো—আর এস ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-১৪২৮), জাবাল-ই-নূর (আরএল-২৫০৫) এবং টিএস ওভারসিস লিমিটেড (আরএল-১৭৫৫)। দীর্ঘদিন ধরেই এই চক্রটি রাশিয়া প্রবাসী হওয়ার লোভনীয় বিজ্ঞাপন ও ভুয়া সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে নিরীহ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল। সম্প্রতি ভুক্তভোগীদের অসহায়ত্বের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর মন্ত্রণালয় দ্রুত তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয় এবং অভিযোগের সত্যতা মেলায় তাৎক্ষণিকভাবে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও কঠোর হুঁশিয়ারি ব্যক্ত করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানান যে, দেশের নাগরিকদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এবং প্রতারণামূলকভাবে বিদেশে পাঠানোর মতো জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত কোনো চক্র, সংস্থা, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। কোনো সুনির্দিষ্ট এজেন্সির অসততা ও লোভের কারণে দেশের রেমিট্যান্সের মূল চালিকাশক্তি তথা সামগ্রিক বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতকে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া যায় না। ভবিষ্যৎ দিনগুলোতে এই ধরনের অপরাধ ও মানবপাচারের মতো ঘটনা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদারকি ও নজরদারি আরও কয়েক গুণ জোরদার করা হবে।
শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মধ্যেই সরকারের তৎপরতা সীমাবদ্ধ নেই, বরং সুদূর রাশিয়ায় আটকে থাকা সেই ৩০ জন বাংলাদেশিকে দ্রুত এবং নিরাপদে স্বদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, ভুক্তভোগীদের ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনা করে তিনি মস্কোয় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূতের সাথে তাৎক্ষণিকভাবে টেলিফোনে যোগাযোগ করেন এবং সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি যুবকদের আইনি ও মানবিক সুরক্ষাসহ সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিশ্চিত করার জন্য জরুরি নির্দেশনা প্রদান করেন।
এদিকে এই ঘটনাটি দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতে একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বর্তমান যুগে দালাল ও ভুয়া এজেন্সির খপ্পরে পড়ে সাধারণ মানুষের সর্বস্বান্ত হওয়ার ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। এই বাস্তবতায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিদেশ গমনেচ্ছু সকল নাগরিকের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে। যেকোনো রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন করার পূর্বে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির বৈধতা, কাজের পরিবেশ, বেতনের সত্যতা এবং চুক্তির শর্তসমূহ সরকারি দপ্তরের মাধ্যমে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করার জন্য মন্ত্রণালয় পুনরায় জোর আহ্বান জানিয়েছে, যাতে করে আর কোনো বাংলাদেশিকে এমন ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার হতে না হয়।