সংবাদ শিরোনাম

মৌসুম শুরুর আগেই ডেঙ্গু মোকাবিলায় রণকৌশল: বেসরকারি হাসপাতালে টেস্ট ফি-তে ৮০% ছাড়, চিকিৎসকের ভিজিট মওকুফ

 প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০২:৪০ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

মৌসুম শুরুর আগেই ডেঙ্গু মোকাবিলায় রণকৌশল: বেসরকারি হাসপাতালে টেস্ট ফি-তে ৮০% ছাড়, চিকিৎসকের ভিজিট মওকুফ

 প্রতিবেদক, ঢাকা : মরণঘাতী মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর সম্ভাব্য প্রকোপ রুখতে এবার আক্ষরিক অর্থেই কোমর বেঁধে নামছে সরকার। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণ যখন নিয়ন্ত্রণহীন রূপ নেয়, তখন প্রশাসনের টনক নড়ে—এমন চেনা ছবি এবার পাল্টে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চিকিৎসা ব্যয় ধরে রাখতে এবং যেকোনো মূল্যে প্রাণহানি ঠেকাতে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর জন্য জারি করা হয়েছে নজিরবিহীন কিছু নির্দেশনা। এখন থেকে বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিতে হবে এবং ভর্তি থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা কোনো ধরনের পরামর্শ ফি বা কনসালটেন্সি ভিজিট নিতে পারবেন না। রোগীরা কেবল প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং খাবারের প্রকৃত খরচ বহন করবেন। একই সঙ্গে ডেঙ্গুর চিকিৎসায় চিকিৎসকদের গাইডলাইন কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই যেন রোগীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে এমন কোনো ওষুধ বা ভুল চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা না হয়।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও গাইডলাইন বিষয়ক’ এক উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী সভায় এই কঠোর ও জনবান্ধব সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে। দেশের স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাসে এই ধরনের সমন্বিত প্রস্তুতিকে বেশ ইতিবাচক ও সময়োপযোগী হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক, প্যাথলজি ল্যাব ও বেসরকারি হাসপাতালের প্রতিনিধি, দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা এবং স্বাস্থ্য খাতের প্রধান অংশীজনরা (স্টেকহোল্ডার) উপস্থিত ছিলেন। সভায় দেশের চিকিৎসা সক্ষমতা, মশা নিধন কার্যক্রম এবং গত কয়েক বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়।

বিগত বছরগুলোতে ডেঙ্গুর পিক-আওয়ারে সাধারণ মানুষের শয্যা সংকট এবং বেসরকারি হাসপাতালের আকাশচুম্বী বিলের কারণে যে চরম ভোগান্তি তৈরি হয়েছিল, তা এবার শুরুতেই রুখে দিতে চায় প্রশাসন। সভা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ডেঙ্গুর সময়ে কোনো হাসপাতালেই যেন শয্যা সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য দেশের সব বেসরকারি হাসপাতালে মোট বেডের ১০ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে সংরক্ষিত ও ফাঁকা রাখতে হবে। ডেঙ্গু পরীক্ষার খরচ সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে আনতে টেস্ট ফি-তে যে বিশাল ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেন তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন যে, মহামারি সদৃশ এই সংকটের সময়ে কোনো প্রতিষ্ঠান যেন বাণিজ্যিক মানসিকতা না দেখায়, বরং মানবিক দিকটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। চিকিৎসকদের ফি মওকুফের সিদ্ধান্তটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসার খরচ বহুগুণ কমিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ওষুধের সঠিক প্রয়োগ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, রোগাক্রান্তদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ও অনুমোদিত জাতীয় গাইডলাইনের বাইরে গিয়ে অন্য কোনো ধরনের পরীক্ষামূলক বা ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ প্রয়োগ করা যাবে না। বিশেষ করে ডেঙ্গুর ভ্যাকসিনের বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি জানান, আন্তর্জাতিকভাবে ডেঙ্গুর কোনো ভ্যাকসিন এখনো সার্বজনীন বা চূড়ান্ত স্বীকৃতি পায়নি। আর এই কারণেই বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তা ছাড়া বাংলাদেশে এখনই কোনো ধরনের ডেঙ্গু ভ্যাকসিন কার্যক্রম চালু করার বা এর ট্রায়াল দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। বরং মশা নিধন এবং আক্রান্তদের সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই হবে মূল লক্ষ্য।


সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো মনে করছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর যেভাবে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা থেকে বড় শিক্ষা নিয়েছে সরকার। আর সে কারণেই এবার মৌসুম শুরুর আগেই মশা নিধন এবং ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে নড়েচড়ে বসেছে স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রশাসন। সাধারণ মানুষের মনেও ডেঙ্গু নিয়ে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন আতঙ্ক কাজ করে, যা দূর করতে এই আগাম প্রস্তুতি মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি দেবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল নীতি নির্ধারণী সভায় সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না, মাঠ পর্যায়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলো এই নির্দেশনা সত্যিই মেনে চলছে কি না, তা কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে। এই জনবান্ধব নির্দেশনাগুলো যদি মাঠ পর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও চিকিৎসা ব্যয় দুটোই উল্লেখযোগ্য হারে কমবে এবং একটি বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে দেশের স্বাস্থ্য খাত।

Advertisement
Advertisement
Advertisement