সংবাদ শিরোনাম

ইউনূসের ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ ও ভেঙে পড়া প্রশাসন সামলানোর নেপথ্য গল্প: আলী ইমাম মজুমদারের বিস্ফোরক বয়ান

 প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০২:৩৫ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

ইউনূসের ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ ও ভেঙে পড়া প্রশাসন সামলানোর নেপথ্য গল্প: আলী ইমাম মজুমদারের বিস্ফোরক বয়ান

অনলাইন ডেস্ক:

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সেই বহুল আলোচিত ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বা অভ্যন্তরীণ নীতি-নির্ধারণী গোষ্ঠী নিয়ে অবশেষে মুখ খুলেছেন সাবেক খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। সম্প্রতি একটি বিশেষ সংলাপে অংশ নিয়ে তিনি সরকারের ভেতরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, এক নজিরবিহীন শাসনতান্ত্রিক সংকট এবং প্রশাসনের ভেতরের নানা টানাপোড়েনের চিত্র অত্যন্ত খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছেন। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে প্রতি মঙ্গলবার একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের আয়োজন করা হতো, যা মূলত ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এই বৈঠকে কারা উপস্থিত থাকবেন তা আগে থেকেই সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত ছিল। তবে এই প্রক্রিয়াকে একেবারে নতুন কিছু মানতে নারাজ সাবেক এই আমলা। তিনি স্পষ্ট করেই বলেন যে, বিশ্বের প্রায় সব সরকারেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধার্থে এ ধরনের একটি ‘ইনার গ্রুপ’ বা অভ্যন্তরীণ বৃত্ত থাকে, যদিও এই বিশেষ বৈঠকের ব্যাপারে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো গেজেট জারি করা হয়নি।

তবে সরকারের কার্যপ্রণালী ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়োগ নিয়ে নিজের মৃদু অসন্তোষ ও বাস্তবতার কথাও লুকাননি আলী ইমাম মজুমদার। সাংবিধানিক শপথের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি প্রজাতন্ত্রের কাজ কীভাবে পরিচালিত হবে তা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্ধারিত বিধির মাধ্যমেই পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু এই সরকারের সময় কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এমন কিছু ব্যক্তির নিয়োগের কথা উল্লেখ করেন, যাদের এই মন্ত্রণালয় পরিচালনার পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। যদিও তিনি মনে করেন, কাকে কোথায় বদলি করা হবে বা না হবে, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র অধিকার প্রধান উপদেষ্টার ছিল।

নিজের উপদেষ্টা পদে আসা এবং সেই ঝোড়ো দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আলী ইমাম মজুমদার জানান, দেশের এক চরম ক্রান্তিকালে প্রধান উপদেষ্টা তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি জনপ্রশাসনের দায়িত্বে না থাকলেও পরিস্থিতির তাগিদে তাকে একদম শুরু থেকেই কাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠনের মাধ্যমে তাকে পূর্ণাঙ্গ উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হলেও শুরুতে তিনি মূলত প্রধান উপদেষ্টার অধীনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ফাইল নিষ্পত্তিতে সরাসরি সহযোগিতা করতেন। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে তার কাজের মেয়াদ ছিল মাত্র ৮৯ দিন। প্রথম দিকে তাকে একটি নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে তাকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়, এবং শেষ দিকে তিনি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও সামলান।

সাবেক এই উপদেষ্টা দেশের তৎকালীন ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, এই অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পেছনে একটি বিশেষ এবং নজিরবিহীন প্রেক্ষাপট ছিল। গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের চেনা ক্ষমতা কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। পুলিশ বাহিনী কাজ ছেড়ে চলে গিয়েছিল, দেশের অসংখ্য থানা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল। এমনকি আমলাতন্ত্রের শীর্ষ পর্যায়ও চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে ছিল। অনেক সচিব প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন, কেউ দেশের বাইরে চলে গিয়েছিলেন তো কেউ দেশের ভেতরেই আত্মগোপনে ছিলেন। এমন একটি অচল রাষ্ট্রযন্ত্রকে সচল করা যে কোনো সরকারের জন্যই এক অসম্ভব চ্যালেঞ্জ।

সরকার পরিচালনার এই জটিল মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলী ইমাম মজুমদার একটি রাজনৈতিক সরকারের সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরেন। সাধারণ নিয়মে একটি রাজনৈতিক সরকারে দলপ্রধানই সরকারপ্রধান হন এবং তিনি নিজের ঘরানার চেনা মানুষদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেন, যেখানে আদর্শিক মিল থাকে। কিন্তু এই অন্তর্বর্তী সরকারটি গঠিত হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন ডিসিপ্লিন বা প্রেক্ষাপট থেকে আসা মানুষদের নিয়ে। আলাদা মানসিকতা ও ভিন্ন ভিন্ন খাতের এই মানুষদের একসঙ্গে মিলিয়ে এক সুতোয় গেঁথে রাষ্ট্র পরিচালনা করা কতটা কঠিন এবং ভয়াবহ চ্যালেঞ্জিং ছিল, আলী ইমাম মজুমদারের পুরো বক্তব্যে সেই রূঢ় বাস্তবতাই ফুটে উঠেছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement