বিদায় জননেতা: মায়ের কোল ঘেঁষেই চিরনিদ্রায় শায়িত হচ্ছেন ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ঘোষক তোফায়েল আহমেদ
অনলাইন ডেস্ক:
বাংলার রাজনৈতিক আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক তোফায়েল আহমেদ আর নেই। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার বিকেলে ৮২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন প্রবীণ এই আওয়ামী লীগ নেতা। তাঁর প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবার মাঝেই বিরাজ করছে এক শূন্যতার আবহ।
বার্ধক্যজনিত নানাবিধ জটিলতায় ভুগছিলেন প্রবীণ এই রাজনীতিক। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর নিউমোনিয়াজনিত তীব্র শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এরপর থেকে সুদীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন তিনি। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে সোমবার বিকেলে তিনি চিরবিদায় নেন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ভিড় জমাতে শুরু করেন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সাধারণ মানুষ।
হাসপাতাল থেকে সোমবার সন্ধ্যায় তোফায়েল আহমেদের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানীর ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে। সেখানে মাগরিবের নামাজের পর তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এই জানাজায় অংশ নেন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। জানাজা শুরুর আগে থেকেই তাকওয়া মসজিদ প্রাঙ্গণ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দলমত নির্বিশেষে সবাই এই প্রবীণ নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে আসেন। জানাজা শেষে উপস্থিত নেতাকর্মীদের অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁরা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিতে শুরু করলে একপর্যায়ে পুলিশের বাধার মুখে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং সেখান থেকে ধানমন্ডি থানা পুলিশ সাতজনকে আটক করে। প্রথম জানাজা সম্পন্ন হওয়ার পর গভীর রাতে তোফায়েল আহমেদের মরদেহ পুনরায় স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার সকালে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে নিজ জন্মভূমি ভোলার উদ্দেশ্যে। সেখানে ভোলা জেলা সরকারি হাই স্কুল মাঠে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। নিজের জেলা ও নির্বাচনী এলাকার মানুষের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে জেলার দক্ষিণ গঙ্গাপুর এলাকার কোরালিয়া গ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে এই জননেতাকে। সেখানে নিজের প্রিয় মায়ের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন তিনি। মায়ের কোল ঘেঁষে এই অন্তিম শয়ান যেন তাঁর বর্ণাঢ্য ও সংগ্রামমুখর জীবনের এক শান্তিপূর্ণ অবসান।
তোফায়েল আহমেদের চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে অবসান হলো বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়ের। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা জেলায় জন্মগ্রহণ করা এই কৃতি সন্তান ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬২ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রখর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ডাকসুর ভিপি হিসেবে তিনি যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁর নেতৃত্বেই ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব আসামিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল। সেই বছরেরই ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার ঐতিহাসিক সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন এই তোফায়েল আহমেদ।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের অন্যতম একজন হিসেবে তিনি সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব লাভ করেন তিনি। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি সদ্য নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং পরবর্তীতে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে যে চমক তিনি দেখিয়েছিলেন, তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশেও। তিনি মোট ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিভিন্ন মেয়াদে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম এবং একমাত্র কন্যা চিকিৎসক তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী ও জামাতা ডা. তৌহিদুজ্জামানকে রেখে গেছেন। তাঁর এই মহাপ্রয়াণ বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি ও ইতিহাসের এক অপূরণীয় ক্ষতি।