ইতিহাসের মোড় ঘোরানো এক রাষ্ট্রনায়কের স্মরণে: শহিদ জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী ও তাঁর বহুমাত্রিক উত্তরাধিকার
বিশেষ প্রতিবেদন: ৩০ মে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান বাঁক বদলের দিন। ১৯৮১ সালের এই অভিশপ্ত ও কালিমালিপ্ত দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের নির্মম বুলেটের আঘাতে শাহাদাতবরণ করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। তাঁর ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। দিনটি উপলক্ষে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জ পর্যন্ত দেশব্যাপী গভীর শ্রদ্ধা ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হচ্ছে এই কালজয়ী নেতাকে। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার এবং ঐতিহাসিক ‘জেড ফোর্স’-এর অধিনায়ক হিসেবে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদান যেমন এদেশের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে, ঠিক তেমনি স্বাধীনতা-পরবর্তী এক বিধ্বস্ত ও দিশেহারা জাতিকে নতুন রাষ্ট্রচিন্তা ও আত্মপরিচয় এনে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অনন্য এক রূপকার।
আজকের এই বিশেষ দিনটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দেশজুড়ে ব্যাপক ও আট দিনব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যা গত ২৫ মে থেকে শুরু হয়েছে এবং আগামী ১ জুন পর্যন্ত চলবে। আজ ভোর ৬টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের সকল স্তরের কার্যালয়ে দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা এবং কালো পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ বেলা ১১টায় দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও সর্বস্তরের লাখো নেতাকর্মী শেরেবাংলা নগরে শহিদ রাষ্ট্রপতির মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও জিয়ারত করবেন। জিয়ারত শেষে মাজার প্রাঙ্গণে জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের উদ্যোগে এক বিশেষ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে মোনাজাত করা হবে। এছাড়া রাজনৈতিক কর্মসূচির গণ্ডি পেরিয়ে দিবসটিকে মানবিক রূপ দিতে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের প্রতিটি থানাসহ সারা দেশের বিভিন্ন ইউনিটে অসচ্ছল ও দুঃস্থ মানুষের মাঝে কাপড়, চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণের ব্যাপক সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরদিন রবিবার দুপুরে রাজধানীর রমনাস্থ ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স (আইইবি) মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে একটি বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাঁর কর্মময় জীবনের ওপর আলোকপাত করবেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ভঙ্গুর, অস্থির ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত রাষ্ট্র বাস্তবতায় জিয়াউর রহমানের উত্থান ছিল এক ঐতিহাসিক অনিবার্যতার ফল। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে যখন তাঁর বজ্রকণ্ঠ ভেসে এসেছিল, তখন তা ছিল দিশেহারা ও আতঙ্কিত বাঙালি জাতির জন্য এক পরম ভরসা এবং সাহসের আলোকবর্তিকা। তিনি কেবল স্বাধীনতার ঘোষণার পাঠকই ছিলেন না, বরং সম্মুখ সমরে ‘জেড ফোর্স’ নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সাহসিকতার সাথে লড়াই করেছেন। তবে জিয়ার আসল ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য প্রকাশ পায় ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, যখন দেশের সামগ্রিক শাসনকাঠামো ভেঙে পড়েছিল এবং অর্থনীতি কার্যত স্থবির হয়ে গিয়েছিল। সেই চরম সংকটের মুখে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে তিনি আবেগ বর্জন করে এক কঠোর বাস্তববাদী ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার নীতি গ্রহণ করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সংকুচিত রাজনৈতিক পরিসরকে ভেঙে তিনি বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনর্প্রবর্তন করেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও ভিন্নমতের চর্চাকে পুনরায় ফিরিয়ে আনেন, যা দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক পদক্ষেপ।
জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অবদান ছিল তাঁর প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর কালজয়ী দর্শন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, এদেশের মানুষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় কেবল ভাষাভিত্তিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, বরং এর সাথে এদেশের ভূখণ্ড, ধর্মীয় মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও সার্বভৌম স্বার্থের এক মেলবন্ধন প্রয়োজন। এই দর্শন গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মাঝে দ্রুত বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে, যার ওপর ভিত্তি করে ১৯৭৮ সালে তিনি গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তিনি রাজনীতি ও উন্নয়নকে শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে যান দেশের আসল চালিকাশক্তি—গ্রামবাংলায়। তাঁর বিখ্যাত ‘খাল খনন কর্মসূচি’ এবং ‘গ্রাম সরকার’ ধারণা এদেশের কৃষি খাতে এক অভাবনীয় বিপ্লবের সূচনা করেছিল, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে অনন্য ভূমিকা রাখে।
একই সাথে আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনীতির দুটি প্রধান স্তম্ভ—তৈরি পোশাক শিল্প এবং রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়—এর ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপিত হয়েছিল তাঁর দূরদর্শী নীতির মাধ্যমে। জিয়াউর রহমানই প্রথম মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বিশাল এক শ্রমবাজার উন্মুক্ত করেছিলেন, যা আজ দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। পররাষ্ট্রনীতিতে তিনি এক অভূতপূর্ব ভারসাম্য এনেছিলেন; চীন, পশ্চিমা বিশ্ব এবং মুসলিম দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য তিনি ‘সার্ক’ (SAARC) গঠনের নেপথ্য স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করেছিলেন।
তাঁর এই প্রাজ্ঞ ও জাদুকরী নেতৃত্ব কেবল দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছিল। তৎকালীন বিশ্ব গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো তাঁকে একজন অত্যন্ত সৎ, কঠোর পরিশ্রমী এবং বাস্তববাদী বা ‘প্র্যাগম্যাটিক লিডার’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। স্পেনের প্রভাবশালী দৈনিক ‘এল পাইস’ থেকে শুরু করে আমেরিকার ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ ও ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর মতো শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলো তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছিল যে, বাংলাদেশ এমন এক রাষ্ট্রনায়ককে হারাল যিনি দিনে মাত্র ৪-৫ ঘণ্টা ঘুমাতেন এবং সৎ সৈনিক-রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজের জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত স্থিতিশীলতার জন্য লড়াই করে গেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর ঢাকার রাজপথে লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও অশ্রুসজল ঢল প্রমাণ করেছিল যে, সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তিনি কতটা গভীর আসন তৈরি করতে পেরেছিলেন। আজ কয়েক দশক পরও বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি স্তরে জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া দূরদর্শী সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী প্রভাব অনস্বীকার্য। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর সততা ও দেশপ্রেম আজও এদেশের কোটি কোটি মানুষের কাছে এক অনন্য অনুপ্রেরণার উৎস এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি চিরকাল এক অবিচ্ছেদ্য ও ঐতিহাসিকভাবে অপরিহার্য নাম হয়ে থাকবেন।