সংবাদ শিরোনাম

মৃত্যুর চাষ ও শতকোটি টাকার ক্ষতি: তরুণদের গ্রাস করছে তামাকের নীল দংশন

 প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬, ১১:৪৫ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

মৃত্যুর চাষ ও শতকোটি টাকার ক্ষতি: তরুণদের গ্রাস করছে তামাকের নীল দংশন

অনলাইন ডেস্ক:

 ৩১ মে, বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। বিশ্বজুড়ে যখন তামাকের আগ্রাসন রুখতে নানা আয়োজন, তখন বাংলাদেশে তামাকের ভয়াবহতা এক চরম উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। এ বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আনমাস্কিং দ্য অ্যাপিল- কাউন্টারিং নিকোটিন অ্যান্ড টোব্যাকো অ্যাডিকশন’, যার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে তরুণ প্রজন্মকে তামাকের ছদ্মবেশী আকর্ষণ থেকে রক্ষা করা। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিপণন কৌশল আর তামাকের বিষাক্ত ধোঁয়ায় প্রতিনিয়ত বিপন্ন হচ্ছে দেশের জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তামাক ব্যবহার করছেন। তামাকের এই মরণকামড়ে প্রতি বছর দেশে প্রায় দুই লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে অকালমৃত্যু এবং পঙ্গুত্বের প্রধান চারটি কারণের একটি হলো তামাক। শুধু ফুসফুসের ক্যানসার বা হৃদরোগই নয়, স্ট্রোক, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস এবং ডায়াবেটিসের মতো মারাত্মক রোগগুলোর পেছনেও প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে এই তামাক। এর ফলে তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা ব্যয় এবং আক্রান্ত মানুষের কর্মক্ষমতা হ্রাসের কারণে দেশের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা।

তামাক শুধু মানবদেহই ধ্বংস করছে না, এটি দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশকেও এক চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ২০২৪ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির মোট আর্থিক পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অথচ এই খাতের বিপরীতে তামাক কোম্পানিগুলো থেকে আহরিত রাজস্ব আয়ের পরিমাণ এর অর্ধেকেরও কম। অর্থাৎ, তামাক থেকে যে নামমাত্র রাজস্ব আসছে, তার চেয়ে দ্বিগুণ অর্থ দেশের মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতিপূরণে অপচয় হয়ে যাচ্ছে।

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ এমনিতেই অত্যন্ত সীমিত—মাত্র তিন কোটি ৭৬ লাখ সাত হাজার একর। অথচ খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাহত করে বাণিজ্যিক স্বার্থে দেদারসে চলছে তামাকের চাষ। তামাক চাষে ব্যবহৃত মোট জমির পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৩তম। বিশ্বের মোট উৎপাদিত তামাকের ১.৩ শতাংশই উৎপাদিত হচ্ছে এই ছোট্ট ভূখণ্ডে। এই আগ্রাসী চাষাবাদের সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসছে দেশের বনাঞ্চলের ওপর। ‘টোব্যাকো অ্যাটলাস’-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৩১ শতাংশ বন নিধনের পেছনে সরাসরি দায়ী তামাক চাষ। বিশেষ করে পার্বত্য ও উপকূলীয় অঞ্চলে তামাকের পাতা শুকানোর (কিউরিং) জন্য নির্বিচারে কাটা হচ্ছে বনের গাছ। এক গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার তিনটি উপজেলাতেই তামাকপাতা শুকানোর কাজে এক বছরে প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি কাঠ পুড়িয়ে ছাই করা হয়েছে, যা ওই অঞ্চলের জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্যকে স্থায়ী হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একই সাথে তামাক চাষে ব্যবহৃত অতিরিক্ত রাসায়নিক ও কীটনাশক মিশছে সংলগ্ন জলাশয় ও নদীর পানিতে, যার ফলে ধ্বংস হচ্ছে মৎস্যসম্পদ এবং উর্বরতা হারাচ্ছে আশেপাশের ফসলি জমি।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, তামাক কোম্পানিগুলোর মূল নজর এখন দেশের ভবিষ্যৎ তথা তরুণ প্রজন্মের ওপর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী অন্তত তিন কোটি ৭০ লাখ কিশোর-কিশোরী নিয়মিত তামাক ব্যবহার করছে। বাংলাদেশে বর্তমান মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪৮ শতাংশই তরুণ-তরুণী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোলের (সিডিসি) এক গবেষণা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ২১ বছর বয়সের আগেই যারা তামাকে আসক্ত হয়ে পড়ে, তাদের মধ্যে নিকোটিন নির্ভরতা এবং আমৃত্যু তামাক ব্যবহারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সুযোগটিকেই কাজে লাগাতে মরিয়া তামাক কোম্পানিগুলো।

কিশোর ও তরুণদের আকৃষ্ট করতে কোম্পানিগুলো নানা ধরনের চতুর ও মনস্তাত্ত্বিক কূটকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সুগন্ধিযুক্ত (ফ্লেভার্ড) তামাকপণ্য বাজারজাতকরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ গজের মধ্যে তামাকপণ্য সহজলভ্য করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় তরুণ ইনফ্লুয়েন্সার ও সেলিব্রেটিদের দিয়ে পরোক্ষভাবে ধূমপানের প্রচারণা চালানো। এমনকি বিভিন্ন তরুণবান্ধব উৎসব ও কনসার্টে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের মাধ্যমে ধূমপানকে একটি ‘ফ্যাশন’ বা ‘স্মার্টনেস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলছে। এর পাশাপাশি দেশে শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন এবং কর বৃদ্ধির যেকোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পর্দার আড়াল থেকে তীব্র প্রতিরোধ ও লবিং চালিয়ে যাচ্ছে এই প্রভাবশালী চক্রটি।

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে এক প্রতিক্রিয়ায় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান ‘প্রজ্ঞা’র (প্রগতির জন্য জ্ঞান) নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের বলেন, বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীই এখন বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলোর প্রধান টার্গেট। ঐতিহ্যবাহী সিগারেটের পাশাপাশি তারা এখন ই-সিগারেট ও ভেপিংয়ের মতো আধুনিক ও ছদ্মবেশী পণ্যের ফাঁদ পাতছে। তামাক ও নিকোটিন আসক্তির এই মরণফাঁদ থেকে তরুণদের সুরক্ষায় সরকারকে অবিলম্বে ই-সিগারেট ও ভেপিংসহ নতুন প্রজন্মের সব ধরনের তামাকপণ্যের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। একই সাথে বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি সংশোধন করে আরও যুগোপযোগী ও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি, অন্যথায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন এবং একটি সুস্থ-সবল বাংলাদেশ বিনির্মাণ অসম্ভব হয়ে পড়বে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement