পশ্চিম তীরে পৃথক হামলায় দুই ফিলিস্তিনি নিহত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
অধিকৃত পশ্চিম তীরে পৃথক দুটি ঘটনায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও সেনাদের গুলিতে দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের একজন ১৭ বছরের কিশোর, অন্যজন ফিলিস্তিনি জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সাবেক কর্নেল। একই সময়ে বাড়িঘরে হামলা, অবরোধ ও বসতি সম্প্রসারণে বাস্তুচ্যুতির চাপও বাড়ছে।
শুক্রবার ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, হেবরনের খিরবেত হামরুশ এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ১৭ বছর বয়সী কারিম সানাদ শালালদেহ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। বুকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সংকটাপন্ন ছিলেন তিনি। হামলায় ৭০ বছর বয়সী আরেক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফার স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানায়, সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের বড় একটি দল এলাকায় ঢুকে বাসিন্দাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং কয়েকটি ফিলিস্তিনি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
একই দিন সকালে জেনিনে ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে নিহত হন ৫৮ বছর বয়সী ফাতহি খাজেম। ফিলিস্তিনি জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সাবেক এই কর্নেলের বাড়িতে ইসরায়েলি বাহিনী অভিযান চালানোর সময় গুলির ঘটনা ঘটে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, সামরিক অভিযানের সময় খাজেম সেনাদের ছুরিকাঘাতের চেষ্টা করেছিলেন। এরপরই সেনারা গুলি চালিয়ে তাঁকে হত্যা করে।
তবে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, খাজেমের মরদেহ পরিবারের কাছে দাফনের জন্য হস্তান্তর করা হয়নি। ওয়াফার খবর অনুযায়ী, গুলির পর জরুরি চিকিৎসাসেবাকর্মীদেরও বাড়িটিতে পৌঁছাতে বাধা দেওয়া হয়।
এর আগে জেনিনের কাছে আরেকটি ইসরায়েলি অভিযানে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর গুলিবিদ্ধ হয়। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, তার বুক ও পিঠে জীবন্ত গুলি লাগে। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। শুক্রবার জেনিন শহরে পৃথক অভিযানে ছয়জনকে আটকও করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
বাড়িতে অবরোধ, বন্ধ খাবার-ওষুধ
পশ্চিম তীরজুড়ে ইসরায়েলি সেনা অভিযান ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলার মধ্যেই নাবলুসের দক্ষিণে কুসরায় তিনটি ফিলিস্তিনি বাড়ি টানা ১৩ দিন ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছে বসতি স্থাপনকারীরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ইসরায়েলি সেনাদের সুরক্ষায় এই অবরোধ চলছে।
কুসরার মেয়র আবদেল আজিম ওয়াদি বলেন, রাস আল-আইন এলাকার পরিবারগুলোকে বাড়িতে ঢোকা বা বের হওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। একটি বাড়ি দখল করে সেটিকে সামরিক পোস্টে পরিণত করা হয়েছে। পুরো এলাকাকে ‘বন্ধ সামরিক এলাকা’ ঘোষণা করা হয়েছে।
ওয়াফার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছাতে বাধা দেওয়ায় অবরুদ্ধ পরিবারগুলোর মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
জাতিসংঘের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিম তীরে সেনা ও বসতি স্থাপনকারীরা পানির পাইপ কেটে দিচ্ছে এবং কুসরায় অবরোধ অব্যাহত রয়েছে।
বাড়ছে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে রাষ্ট্রসমর্থিত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার কারণে ১০৭টি ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
সংস্থাটির মতে, বসতি স্থাপনকারীদের বাড়তে থাকা হামলা এবং আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ ইসরায়েলি বসতির দ্রুত সম্প্রসারণ পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদের পরিস্থিতি তৈরি করছে।
এরই মধ্যে অধিকৃত পশ্চিম তীরকে কার্যত দুই ভাগে ভাগ করে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করা ই-১ বসতি প্রকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়ছে। প্রকল্পটির আওতায় ১ হাজার ২০০টির বেশি আবাসিক ইউনিট নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করেছে ইসরায়েল।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, কানাডা ও নরওয়ে যৌথ বিবৃতিতে এই পদক্ষেপকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের ভাষায়, প্রকল্পটি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভৌগোলিক সংযোগ নষ্ট করবে এবং শান্তির সম্ভাবনা আরও দূরে সরিয়ে দেবে।
সূত্র: আলজাজিরা