ইসরায়েলি হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের ন্যায়বিচারের লড়াই

 প্রকাশ: ২২ অগাস্ট ২০২৬, ১১:২৬ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলি হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের ন্যায়বিচারের লড়াই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের পরিবারগুলোর কাছে ন্যায়বিচার পাওয়া যেন আরেকটি দীর্ঘ লড়াই। প্রিয়জন হারানোর শোকের সঙ্গে তাঁদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে দায়ীদের জবাবদিহির দাবিও। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের শিকারদের স্মরণ দিবসে সেই পরিবারগুলোর ক্ষত আবারও সামনে এসেছে।

অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের শুফাত এলাকায় ১৬ বছর ধরে স্বামী জিয়াদ জিলানির ফেরার অপেক্ষায় আছেন মোইরা জিলানি। কাজ শেষে সিঁড়ি বেয়ে স্বামী ঘরে ফিরবেন-সেই অপেক্ষার স্মৃতি এখনো তাঁর কাছে জীবন্ত।

২০১০ সালের ১১ জুন জিয়াদ পিকআপ চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। ওয়াদি আল-জোজ এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনী ও পাথর নিক্ষেপকারী ফিলিস্তিনি তরুণদের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যান তিনি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি পাথর তাঁর গাড়ির সামনের কাচে আঘাত করলে গাড়িটি দুই পুলিশ সদস্যকে সামান্য আহত করে। এরপর এক সীমান্ত পুলিশ সদস্য তাঁর দিকে গুলি চালান।

গাড়ি থেকে নিরাপদে সরে যাওয়ার সময় জিয়াদকে পেছন থেকে গুলি করা হয়। মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর কাছ থেকে তাঁর মাথায় আরও দুইবার গুলি করা হয়।

ইসরায়েলি মানবাধিকার আইনজীবীদের এক তদন্তের বরাত দিয়ে মোইরা বলেন, জিয়াদকে গুলি করা কর্মকর্তা ম্যাক্সিম ভিনোগ্রাদভ এর কিছুদিন আগে অনলাইনে আরবদের হত্যার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তবে ভিনোগ্রাদভ ও তাঁর কমান্ডারের বিরুদ্ধে মামলা পরে প্রমাণের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। কারও বিচার হয়নি।

জিয়াদকে হত্যার পর ইসরায়েলি পুলিশ তাঁকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সেই পরিচয়ের বোঝা এখনো পরিবারটিকে বহন করতে হচ্ছে। মোইরা তাঁর মেয়েদের অনলাইনে বাবার সম্পর্কে তথ্য না খোঁজার পরামর্শ দিয়েছিলেন, কারণ তাঁর বিরুদ্ধে ছড়ানো তথ্যকে তিনি মিথ্যা বলে মনে করেন।

‘সে সবাইকে ভালোবাসত’

মোহাম্মদ আবু খাদিরের বাবা হুসেইন আবু খাদিরও ছেলের হত্যার বিচার নিয়ে একই প্রশ্ন বহন করছেন। ২০১৪ সালের ২ জুলাই শুফাত এলাকায় বাড়ির সামনে থেকে ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদকে অপহরণ করা হয়।

হুসেইনের স্মৃতিতে ছেলে ছিল গান গেয়ে ও নেচে বাড়ি ফেরা এক প্রাণবন্ত কিশোর। রমজানের আগে এলাকার রাস্তায় বাতি সাজাতে সে সাহায্য করেছিল, বড়দের সঙ্গে দবকেও নেচেছিল। পরিবারের ইলেকট্রনিকসের দোকানে ইহুদি ও আরব-সব ক্রেতার সঙ্গেই সে সমান আচরণ করত।

ভোররাতে একটি গাড়িতে করে তাকে তুলে নিয়ে পশ্চিম জেরুজালেমের একটি জঙ্গলে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে মারধর করা হয় এবং জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

ধারণা করা হয়, তিন ইসরায়েলি ব্যক্তি আগের দিন নিহত তিন ইসরায়েলি কিশোরের প্রতিশোধ নিতে মোহাম্মদকে হত্যা করেছিল। প্রধান আসামি ইয়োসেফ হাইম বেন-দাভিদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক সহযোগীকেও দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আপিলেও তাঁদের দণ্ড বহাল থাকে।

হুসেইনের প্রশ্ন, হত্যাকারীরা নিজেরাই যদি স্বীকার করে থাকে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মোহাম্মদকে হত্যা করা হয়েছিল, তাহলে সন্ত্রাসবাদের শিকারদের তালিকায় তাঁর ছেলের নাম থাকবে না কেন?

তাঁর অভিযোগ, ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিবেশ এখন হত্যাকারীদের পক্ষে আরও অনুকূল হয়েছে। গত বছর ৫৫ জন ইসরায়েলি আইনপ্রণেতা, তাঁদের মধ্যে ১১ জন মন্ত্রী, ফিলিস্তিনিদের হত্যায় দণ্ডিত ইসরায়েলি নাগরিকদের ক্ষমার আহ্বান জানিয়ে চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়।

হুসেইনের ভাষায়, ফিলিস্তিনি কেউ কোনো ইসরায়েলিকে পুড়িয়ে মারলে তাঁর বাড়ি ধ্বংস করে পরিবারকে কারাগারে পাঠানো হতো। অথচ তাঁর ছেলের হত্যাকারীদের মুক্তির দাবি উঠছে।

বিচারের পথ কতটা বন্ধ

জিয়াদ ও মোহাম্মোদের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। নিহত ফিলিস্তিনিদের পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই আরও অনেক নাম মনে করিয়ে দেন।

২০২০ সালে বোনের বিয়ের দিন চেকপয়েন্টে গুলিতে নিহত হন আহমেদ এরেকাত। শুরুতে তাঁকে গাড়ি হামলার জন্য দায়ী করা হলেও পরে সেই অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

সেই বছরই জেরুজালেমের পুরোনো শহরে ইসরায়েলি পুলিশের গুলিতে নিহত হন অটিজমে আক্রান্ত তরুণ ইয়াদ হাল্লাক। তাঁর দেখভালকারী নারী বারবার জানিয়েছিলেন, তিনি নিরস্ত্র ও প্রতিবন্ধী। যে পুলিশ সদস্য তাঁকে গুলি করেছিলেন, ২০২৩ সালে অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগ থেকে তিনি খালাস পান।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরের উম্ম আল-খাইর এলাকায় ফিলিস্তিনি বাবা ও স্থানীয় সংগঠক আওদাহ হাতালিনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার ভিডিওতে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ইয়িনন লেভিকে গুলি করতে দেখা যায়। এ বছরের আগস্টে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। মানবাধিকার সংগঠন ইয়েশ দিন বলছে, ২০১৯ সালের পর কোনো ফিলিস্তিনিকে হত্যার ঘটনায় কোনো ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর বিরুদ্ধে এটিই প্রথম অভিযোগ গঠন।

আল জাজিরার সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহও ২০২২ সালে জেনিনে ইসরায়েলি অভিযান কাভার করার সময় নিহত হন। তাঁর পরনে প্রেস জ্যাকেট ছিল। জাতিসংঘ ও একাধিক সংবাদমাধ্যমের তদন্তে তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়ে থাকতে পারে বলে উঠে এলেও চার বছর পরও কোনো ইসরায়েলি সেনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি।

ইয়েশ দিনের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে তদন্ত হওয়া ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের মাত্র প্রায় ৩ শতাংশের সাজা হয়েছে। ৯৩ দশমিক ৮ শতাংশ তদন্ত কোনো অভিযোগপত্র ছাড়াই বন্ধ হয়ে গেছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে ১ হাজার ১০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠন বিটসেলেমের তথ্য। নিহতদের মধ্যে ২৪২ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।

এই সময় ফিলিস্তিনি বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগও বেড়েছে। পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের ঘটনা নিয়মিত হয়ে উঠেছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে।

২০১৫ সালে পশ্চিম তীরের দুমা গ্রামে একটি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে শিশু আলি দাওয়াবশেহ ও তাঁর বাবা সাদ এবং মা রিহাম নিহত হন। তাঁদের চার বছর বয়সী ছেলে আহমেদ গুরুতর দগ্ধ হলেও বেঁচে যায়।

হামলাকারী আমিরাম বেন-উলিয়েল ২০২০ সালে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান। পরে তাঁর মুক্তির দাবিতে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এতে ১০ লাখ শেকেলের বেশি অর্থ উঠেছে এবং কয়েকজন ক্ষমতাসীন আইনপ্রণেতাও তাঁকে সমর্থন করেছেন।

‘তদন্তের নামে দায় এড়ানো’

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতার ক্ষেত্রে জবাবদিহির অভাবই ইসরায়েলের দ্বিস্তরীয় বিচারব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বিটসেলেমের মুখপাত্র ইয়ার ডভিরের অভিযোগ, ইসরায়েলি সামরিক আইন প্রয়োগব্যবস্থা প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা নয়; বরং তদন্তের আড়ালে দায়ীদের রক্ষা করার ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে।

ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠন আল-হকের উপপরিচালক তাহসিন এলায়ান বলেন, ফিলিস্তিনিদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করাও দায়মুক্তির একটি উপায়। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক আইনে যে সুরক্ষা পাওয়ার কথা, এই পরিচয় চাপিয়ে দিয়ে ফিলিস্তিনি ভুক্তভোগীদের সেই সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়।

জিয়াদের স্ত্রী মোইরার কাছেও ‘সন্ত্রাসী’ শব্দটি এখনো একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা। তাঁর ভাষায়, হিজাব পরলেই তিনি সেই দৃষ্টিভঙ্গি অনুভব করেন; অথচ অন্য পোশাকে তাঁকে আর একইভাবে দেখা হয় না।

মোহাম্মোদের বাবা হুসেইন চান, তাঁর ছেলের নাম মানুষ অন্যভাবে মনে রাখুক। তাঁর কাছে মোহাম্মদ ছিল একজন ফিলিস্তিনি আরব শিশু, যে পরিচয়ের কারণেই নিহত হয়েছে।

বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও শোক কমেনি। মোহাম্মোদের মৃত্যুবার্ষিকীতে হুসেইন ও তাঁর স্ত্রী ছেলের ছবি হাতে বাড়ি থেকে কবর পর্যন্ত যান। আর ওই দিনটি ঘনিয়ে এলেই পরিবারটির ভেতরে পুরোনো ক্ষত আবারও জেগে ওঠে।

মোইরা অবশ্য ‘পেরেন্টস সার্কেল’ নামে একটি সংগঠনের মাধ্যমে কিছুটা মানসিক সহায়তা পেয়েছেন। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রিয়জন হারানো ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি পরিবারগুলোকে এই সংগঠন একসঙ্গে নিয়ে আসে।

ছোট মেয়েকে বাবার গল্প শুনিয়ে তাঁর স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখেন মোইরা। জিয়াদের মৃত্যুর ১৬ বছর পরও তাঁর প্রতি ভালোবাসা কমেনি। বরং সময় পেরিয়ে তিনি আরও গভীরভাবে বুঝেছেন, স্বামী তাঁর জীবনে কী রেখে গেছেন এবং তাঁর চোখ দিয়ে চারপাশের বাস্তবতাকে কীভাবে দেখতে শিখেছিলেন।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement