ট্রাম্প আমলে ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’ সম্পাদক বরখাস্ত

 প্রকাশ: ২২ অগাস্ট ২০২৬, ১১:২০ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ট্রাম্প আমলে ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’ সম্পাদক বরখাস্ত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর প্রধান সম্পাদক এরিক স্লাভিনকে বরখাস্ত করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। একই সঙ্গে পত্রিকাটির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রতিবেদক লারা কোর্টেকেও চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

স্লাভিন শুক্রবার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) জানান, তিনি এবং কোর্টে দুজনই চাকরি থেকে অব্যাহতির নোটিশ পেয়েছেন। পত্রিকাটির দীর্ঘদিনের প্রকাশক ম্যাক্স লেডারারও একই ধরনের নোটিশ পেয়েছেন। তিনি অবশ্য সেপ্টেম্বরের শেষে অবসরে যাওয়ার কথা আগেই জানিয়েছিলেন।

স্লাভিনের দাবি, ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষার প্রচেষ্টার বিষয়ে তাঁরা প্রকাশ্যে কথা বলেছিলেন বলেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

পেন্টাগন ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-কে অর্থায়ন করলেও সামরিক বাহিনী নিয়ে স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশের নীতি দীর্ঘদিন ধরে বজায় রেখেছে পত্রিকাটি। স্লাভিন বলেন, আইন এবং প্রতিরক্ষা দপ্তরের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী পত্রিকাটির সম্পাদকীয় স্বাধীনতা বজায় থাকা উচিত।

তাঁর ধারণা, সিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন-সামরিক সদস্যদের জন্য প্রকাশিত সংবাদে সম্ভাব্য সেন্সরশিপ একটি ‘লাল রেখা’ হবে। এ বক্তব্যের কারণেই তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

১৯ শতকে প্রতিষ্ঠিত ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’ মার্কিন সামরিক বাহিনীর সংবাদ পরিবেশনে দীর্ঘ ইতিহাসের অধিকারী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিদেশে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের জন্য এটি সরকারি সংবাদপত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে শুক্রবারের বরখাস্তের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পেন্টাগন ইতিমধ্যে সাংবাদিকদের দপ্তরের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশের সুযোগ সীমিত করেছে। সংবাদ প্রকাশ নিয়ে মতবিরোধের জেরে ট্রাম্প প্রশাসন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, বিবিসি ও নিউইয়র্ক টাইমসসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপও নিয়েছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আলোচনায় আসে ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’। নভেম্বর থেকে রেকর্ড সময় ধরে মোতায়েন থাকা এই জাহাজে কর্মরত কয়েকজন নাবিকের আত্মহত্যার চিন্তা বা জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টার ঘটনাও পত্রিকাটি তুলে ধরে।

ট্রাম্প প্রশাসন এসব প্রতিবেদনকে অতিরঞ্জিত ও ‘অসৎ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

পত্রিকাটির ওপর চাপ অবশ্য কয়েক মাস ধরেই বাড়ছিল। জানুয়ারিতে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল ঘোষণা করেছিলেন, ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-কে তার ‘মূল দায়িত্বে’ ফিরিয়ে নেওয়া হবে-অর্থাৎ সামরিক সদস্যদের জন্য সংবাদ পরিবেশনে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেছিলেন, সামরিক সদস্যদের মনোবল ক্ষুণ্ন করে-এমন ‘ওয়োক’ বিষয় থেকে পত্রিকার বিষয়বস্তু সরিয়ে যুদ্ধ, অস্ত্রব্যবস্থা, শারীরিক সক্ষমতা, প্রাণঘাতী সক্ষমতা ও টিকে থাকার মতো সামরিক বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের পুনর্মুদ্রণ ও ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক গসিপও বন্ধ করার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।

এরপর পত্রিকাটিতে কয়েকটি পরিবর্তন নিয়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষাকারী সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানায়। এপ্রিলে পত্রিকাটির ওমবাডসম্যান জ্যাকুলিন স্মিথকে বরখাস্ত করা হয়। তাঁর দায়িত্ব ছিল পত্রিকার নৈতিকতা ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষায় ভূমিকা রাখা।

এ ছাড়া পেন্টাগনের মুখপাত্র নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন উইলিয়াম আরবানকে পত্রিকাটির উপপ্রকাশক করা হয়। প্রকাশক লেডারারকে আগেভাগে না জানিয়েই এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।

পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার সময় লেডারারও পেন্টাগনের নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্যের কথা উল্লেখ করেন। এক স্মারকে তিনি বলেন, পত্রিকাটির বিষয়ে প্রতিরক্ষা দপ্তরের নেতৃত্ব যে পথে এগোতে চাইছে, তার সঙ্গে তাঁর নেতৃত্বের দর্শনের ‘মৌলিক’ পার্থক্য রয়েছে।

অন্যদিকে আরবান শুক্রবার ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক চিঠিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক সদস্যদের কাছে ‘বিশ্বাসযোগ্য ও সম্পাদকীয়ভাবে স্বাধীন’ সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার ঐতিহ্যের প্রশংসা করেন। তবে বর্তমান ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল সাংবাদিকতার সঙ্গে তাল মেলাতে ধীরগতির বলে সমালোচনা করে তিনি পত্রিকাটির আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি দেন।

শুক্রবারের এই ব্যাপক কর্মী পরিবর্তনের পর পত্রিকাটির ভবিষ্যৎ এবং স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

সোসাইটি অব প্রফেশনাল জার্নালিস্টসের সভাপতি ক্রিস ভাকারো বলেন, সাংবাদিক বা সম্পাদকীয় নেতাদের যদি নিজেদের স্বাধীন প্রতিবেদন নিয়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের প্রতিশোধের আশঙ্কায় থাকতে হয়, তাহলে ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’ তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারবে না।

তিন ডেমোক্র্যাট সিনেটর-রিচার্ড ব্লুমেনথাল, এলিজাবেথ ওয়ারেন ও জিন শাহিন-পেন্টাগনপ্রধান পিট হেগসেথকে দেওয়া এক যৌথ চিঠিতে পত্রিকাটির স্বাধীনতা ‘ক্ষয়ে যাওয়ার’ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছেন।

তাঁরা বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিদেশে ও যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা মার্কিন সেনারা ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন সংবাদের ওপর নির্ভর করেছেন। তাঁদের মতে, সেই আস্থা টিকিয়ে রাখতে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের জনসংযোগ কার্যক্রমের মধ্যে স্পষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement