ডিসলেক্সিয়া নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যে ক্ষোভ, নতুন করে সামনে পুরোনো ভুল ধারণা

 প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৭ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ডিসলেক্সিয়া নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যে ক্ষোভ, নতুন করে সামনে পুরোনো ভুল ধারণা

ডেক্স নিউজ:

 মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সাম্প্রতিক মন্তব্য ডিসলেক্সিয়া নিয়ে আবারও জনমনে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তার বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক সমালোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি এমন একটি ক্ষতিকর সামাজিক ধারণাকে উসকে দিয়েছে, যেখানে এখনো অনেকেই মনে করেন ডিসলেক্সিয়া মানেই কম মেধা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে ট্রাম্প ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসামকে আক্রমণ করে বলেন, একজন জাতীয় নেতার মধ্যে “শেখার সমস্যা” থাকা উচিত নয়। এই মন্তব্যে ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত বহু মানুষ নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন করে আঘাতের মিল খুঁজে পেয়েছেন।

১৮ বছর বয়সী লরিন মুলার বলেন, ছোটবেলা থেকেই তাকে নিজের শেখার ভিন্নতাকে ঘিরে নানা মানসিক চাপের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। ট্রাম্পের মন্তব্য শুনে সেই পুরোনো অনুভূতিগুলো আবার ফিরে এসেছে।

তার ভাষায়,
“আমরা ছোটবেলা থেকেই নিজেকে প্রমাণ করার লড়াই করি। জাতীয় পর্যায়ে এমন মন্তব্য শুনলে মনে হয় সমাজ এখনো আমাদের ঠিকভাবে বুঝতে শেখেনি।”

বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সম্পর্ক নেই

বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ডিসলেক্সিয়া কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক সীমাবদ্ধতা নয়। এটি মূলত ভাষা পড়া, শব্দ চিনে নেওয়া এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি স্নায়বিক পার্থক্য।

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির স্নায়ুবিজ্ঞানী জন গ্যাব্রিয়েলি বলেন,
“ডিসলেক্সিয়া আক্রান্ত মানুষের চিন্তার ক্ষমতা কমে যায় না। তাদের মস্তিষ্ক কেবল তথ্যকে আলাদা উপায়ে গ্রহণ করে।”

তার মতে, এই ধরনের মন্তব্য জনসাধারণের মধ্যে দীর্ঘদিনের ভুল ধারণাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

সমালোচনা এসেছে নিজ শিবির থেকেও

ট্রাম্পের বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যেই নয়, তার সমর্থকদের একাংশের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি করেছে। লরিনের মা মেরিলিন মুলার, যিনি অতীতে ট্রাম্পকে সমর্থন করেছেন, তিনিও প্রকাশ্যে হতাশা জানিয়েছেন।

তিনি বলেন,
“ডিসলেক্সিয়াকে অযোগ্যতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা শুধু ভুল নয়, এটি কষ্টদায়কও।”

অদৃশ্য প্রভাব

ডিসলেক্সিয়া নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, এ ধরনের মন্তব্যের প্রভাব সবসময় প্রকাশ্যে বোঝা যায় না। কিন্তু এটি শিশু-কিশোরদের আত্মবিশ্বাসকে গভীরভাবে নষ্ট করতে পারে।

উটাহভিত্তিক গবেষক লিয়া বিটি, যিনি নিজেও ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত, বলেন,
“ক্ষতিটা সবসময় দৃশ্যমান হয় না। কখনো একজন শিক্ষার্থী চুপ হয়ে যায়, কখনো কেউ নিজের সক্ষমতা নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করে।”

ভিন্নতা, দুর্বলতা নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিসলেক্সিয়াকে এখন অনেকেই ‘অক্ষমতা’ নয়, ‘শেখার ভিন্নতা’ হিসেবে দেখার পক্ষে। কারণ বহু গবেষণায় দেখা গেছে, ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেকেই সৃজনশীল চিন্তা, সমস্যা সমাধান এবং উদ্ভাবনী দক্ষতায় এগিয়ে থাকেন।

গ্যাভিন নিউসামও এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন,
“শেখার ভিন্নতা একজন মানুষকে থামিয়ে দেয় না; বরং অনেক সময় সেটিই তার শক্তির জায়গা হয়ে ওঠে।”

নেতার ভাষার সামাজিক প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্য সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই ডিসলেক্সিয়ার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে অসতর্ক মন্তব্য কেবল একজনকে নয়, একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া অসংখ্য মানুষকে আঘাত করতে পারে।

এই বিতর্ক আবারও স্পষ্ট করেছে—
ডিসলেক্সিয়া কোনো দুর্বলতা নয়; এটি শেখার আরেকটি স্বতন্ত্র উপায়।

Advertisement
Advertisement
Advertisement