৩২ বছর পর আবার আকাশপথে কুমিল্লা, আধুনিকায়নে এগোচ্ছে বিমানবন্দর
অনলাইন ডেস্ক:
প্রায় তিন দশক ধরে কুমিল্লার আকাশে যাত্রীবাহী
বিমানের দেখা নেই। ১৯৯৪ সালে স্বল্প সময়ের জন্য বিমান চলাচল শুরু হলেও যাত্রী সংকটে
তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কেটে গেছে ৩২ বছর। তবে দীর্ঘদিন যাত্রীবাহী ফ্লাইট বন্ধ থাকলেও
পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়নি কুমিল্লা বিমানবন্দর। এর নেভিগেশন ব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রতিদিন
দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিমান চলাচল করছে এবং এ খাত থেকে নিয়মিত রাজস্ব পাচ্ছে সরকার।
এবার দীর্ঘদিনের বন্ধ থাকা এ বিমানবন্দরকে
আবার অভ্যন্তরীণ যাত্রীবাহী ফ্লাইটের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে
নেভিগেশনাল সরঞ্জামের আধুনিকায়ন চলছে। বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রানওয়ে সংস্কার,
অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ সরঞ্জাম
স্থাপন করা গেলে কুমিল্লা থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল শুরু করা সম্ভব।
আট আঞ্চলিক বিমানবন্দর নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা
দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী
করা, পর্যটন ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে বন্ধ থাকা
আটটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই তালিকায় রয়েছে কুমিল্লা
বিমানবন্দরও।
পরিকল্পনায় থাকা অন্য বিমানবন্দরগুলো
হলো—বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, ঈশ্বরদী, শমশেরনগর, খানজাহান আলী
ও পটুয়াখালী বিমানবন্দর।
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল
মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানিয়েছেন, অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে
একটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যাত্রা শুরু
কুমিল্লা বিমানবন্দরের ইতিহাস বেশ পুরোনো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪০ সালে নেউরা-ঢুলিপাড়া এলাকায় এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রথমদিকে
সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হলেও ১৯৬৬ সালে সাধারণ যাত্রীদের জন্য বিমানবন্দরটি উন্মুক্ত
করা হয়।
১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ
রুটে নিয়মিত বিমান চলাচল ছিল। পরে যাত্রী সংকটের কারণে ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯৪ সালে আবারও বিমান
চলাচল শুরু হয়। কিন্তু যাত্রীসংখ্যা প্রত্যাশিত মাত্রায় না থাকায় মাত্র দুই সপ্তাহের
মধ্যেই এয়ারলাইনগুলো ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দেয়। এরপর আর যাত্রীবাহী বিমান নিয়মিতভাবে
এই বিমানবন্দরে ওঠানামা করেনি।
বিমান না নামলেও সরকারের আয়
যাত্রীবাহী বিমান চলাচল বন্ধ থাকলেও কুমিল্লা
বিমানবন্দর থেকে সরকারের আয় থেমে নেই। বিমানবন্দরের ডিভিওআর ও ডিএমই নেভিগেশন সিগন্যাল
ব্যবহার করছে বিভিন্ন দেশের উড়োজাহাজ।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী,
প্রতিদিন ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি বিমান এই
নেভিগেশন সুবিধা ব্যবহার করে। এর মধ্যে ভারতের অভ্যন্তরীণ রুটের বিমানও রয়েছে। আগরতলাগামী
উড়োজাহাজের পাশাপাশি ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরের রুটের বিমানও এ সিগন্যাল ব্যবহার করে।
এ খাত থেকে প্রতি মাসে সরকারের প্রায়
আড়াই কোটি টাকা রাজস্ব আয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
৭৭ একরের বিমানবন্দরে বদলে গেছে পরিবেশ
প্রায় ৭৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লা
বিমানবন্দরের বর্তমান চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। যাত্রীবাহী ফ্লাইট না থাকায় বিমানবন্দরের
বিভিন্ন অংশে আগাছা ও ঘাস জন্মেছে। কোথাও কোথাও গরুর ঘাস চাষ করা হয়েছে। রয়েছে ছোট
ছোট কয়েকটি পুকুরও।
এ ছাড়া বিমানবন্দরের উড্ডয়ন ও অবতরণের
জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার আশপাশে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু আবাসিক ভবন। কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা,
পরিকল্পনাহীনভাবে জনবসতি বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাজনিত
সমস্যা তৈরি হতে পারে।
রানওয়ের বিভিন্ন অংশের পিচও ক্ষতিগ্রস্ত
হয়েছে। কোথাও পিচ উঠে পাথরের কণা বের হয়ে এসেছে এবং আগাছা জন্মেছে। ফলে পুনরায় বিমান
চালুর আগে রানওয়ের বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।
বড় বিনিয়োগ ছাড়াই চালু সম্ভব: কর্মকর্তারা
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে,
নতুন করে বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন নেই। পর্যাপ্ত জমি ইতোমধ্যেই
বিমানবন্দরের অধীনে রয়েছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সংস্কার ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত
করলেই বিমান চলাচল শুরু করা সম্ভব।
এর জন্য রানওয়ে কার্পেটিং, ফায়ার ব্রিগেডের
ব্যবস্থা, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারে উড়োজাহাজের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ভিএইচএফ
সেট স্থাপনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে।
বর্তমানে বিমানবন্দরটিতে ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী
তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করছেন।
কুমিল্লা বিমানবন্দরের সিএনএস প্রকৌশলী
মো. নাসির উদ্দিন আহমদ বলেন, বিমানবন্দরটির নেভিগেশন ব্যবস্থা সচল রয়েছে এবং বিভিন্ন
দেশের উড়োজাহাজ প্রতিদিন এখানকার ডিভিওআর ও ডিএমই সিগন্যাল ব্যবহার করছে। বর্তমানে
নেভিগেশনাল যন্ত্রপাতি হালনাগাদের কাজ চলছে।
তার ভাষ্য, রানওয়ে সংস্কার, ফায়ার ব্রিগেড,
টাওয়ারে ভিএইচএফ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা গেলে অভ্যন্তরীণ
রুটে বিমান চলাচলে বড় কোনো বাধা থাকবে না।
তবে বিমানবন্দরের আশপাশে অপরিকল্পিতভাবে
ভবন নির্মাণকে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। ভবিষ্যতে বিমানবন্দর এলাকার
আশপাশে নিয়মবহির্ভূত স্থাপনা নির্মাণ ঠেকাতে নজরদারি করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
কুমিল্লা ইপিজেডে বাড়ছে অর্থনৈতিক গুরুত্ব
বিমানবন্দরটির পাশেই রয়েছে কুমিল্লা রপ্তানি
প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড)। এখানে দেশি-বিদেশি ৪৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কার্যক্রম
পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কুমিল্লা ইপিজেড থেকে ৯০২ দশমিক ২২ মিলিয়ন
মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল
৫৬৫ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮১৪ দশমিক ৮২ মিলিয়ন
ডলারে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ৭৯০ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে
৭১১ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়।
ব্যবসায়ীদের মতে, কুমিল্লায় বিমান যোগাযোগ
চালু হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের যাতায়াত সহজ হবে। এর ফলে শিল্প ও বিনিয়োগ
সম্প্রসারণের পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।
প্রবাসীদের ভোগান্তি কমবে
প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা হিসেবে কুমিল্লার
আলাদা পরিচিতি রয়েছে। গত পাঁচ বছরে জেলা থেকে চার লাখেরও বেশি মানুষ কর্মসংস্থানের
জন্য বিদেশে গেছেন।
জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের তথ্য
অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৭৬ হাজার ৩৩১ জন, ২০২৪ সালে ৯২ হাজার ৯১১ জন, ২০২৩ সালে ১ লাখ ১৩
হাজার ৫২০ জন, ২০২২ সালে ১ লাখ ৫ হাজার ৯৯৭ জন এবং ২০২১ সালে ৬৮ হাজার ৫৮৬ জন বিদেশে
কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান।
বর্তমানে এসব যাত্রীর বড় অংশকে আন্তর্জাতিক
ভ্রমণের জন্য ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অথবা চট্টগ্রামের শাহ আমানত
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হয়। এতে অতিরিক্ত সময়, অর্থ ও ভোগান্তি পোহাতে
হয়।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কুমিল্লা বিমানবন্দর
চালু হলে শুধু প্রবাসীদের যাতায়াত সহজ হবে না, বৃহত্তর কুমিল্লার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও
নতুন গতি আসবে।
ব্যবসায়ী ও গবেষকদেরও একই দাবি
কুমিল্লা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির
সভাপতি ডা. আজম খান নোমান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের
জন্য কুমিল্লায় বিমান যোগাযোগ চালু করা এখন সময়ের দাবি। এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ
নেওয়া প্রয়োজন।
কুমিল্লার ইতিহাসবিদ ও গবেষক আহসানুল
কবীরের মতে, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কুমিল্লা বিমানবন্দরটি
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের যাতায়াতের পাশাপাশি পণ্য পরিবহন, পর্যটন, শিল্প ও প্রবাসী
যাত্রীসেবায় এ বিমানবন্দরের বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরের নেভিগেশন ব্যবস্থা
আগে থেকেই সচল এবং এ থেকে সরকার নিয়মিত রাজস্বও পাচ্ছে। ফলে সম্পূর্ণ নতুন বিমানবন্দর
তৈরির তুলনায় তুলনামূলক কম বিনিয়োগে কুমিল্লা বিমানবন্দরকে আবার যাত্রীসেবার আওতায়
আনা সম্ভব।
কুমিল্লার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা
পূরণে সার্বিক দিক বিবেচনা করে দ্রুত বিমানবন্দরটি চালুর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন
তিনি।
সব মিলিয়ে, ৩২ বছর ধরে যাত্রীবাহী বিমানের অপেক্ষায় থাকা কুমিল্লা
বিমানবন্দর এখন নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে। আধুনিকায়ন, নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত সংস্কারের
কাজ এগিয়ে নিতে পারলে আবারও কুমিল্লার রানওয়েতে যাত্রীবাহী বিমানের চাকা গড়ানোর পথ
তৈরি হতে পারে।