তরুণ স্পেনের সামনে অসহায় ছিল মেসির আর্জেন্টিনা
ক্রীড়া ডেস্ক:
নিউ জার্সিতে বিশ্বকাপের ফাইনালে শিরোপাধারী আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। পুরো ম্যাচে বলের নিয়ন্ত্রণ, কৌশলগত শৃঙ্খলা এবং রক্ষণে দুর্দান্ত দৃঢ়তার মাধ্যমে লিওনেল মেসিদের কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে আসে শিরোপা নির্ধারণী জয়ের মুহূর্ত।
মাত্র ৩৪ দিন আগে কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছিল স্পেন। সেই হতাশার শুরু থেকে ধাপে ধাপে নিজেদের ছন্দে ফিরে তারা শেষ পর্যন্ত ট্রফি হাতে উল্লাস করেছে। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করেছে দলটি। একই সঙ্গে তাদের অপরাজিত থাকার ধারাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে টানা ৩৮ ম্যাচে।
এই সাফল্যের বড় ভিত্তি ছিল তরুণদের ওপর আস্থা। ৪৮ দলের মধ্যে স্পেনের স্কোয়াড ছিল ষষ্ঠ সর্বকনিষ্ঠ। গড় বয়স ২৬ দশমিক ১৯ বছর, আর ৩০ বছরের বেশি বয়সী খেলোয়াড় ছিলেন মাত্র ছয়জন। বিপরীতে ব্রাজিলের দলে ৩০ বছরের বেশি বয়সী খেলোয়াড় ছিলেন ১১ জন এবং গড় বয়স ছিল ২৮ দশমিক ৬৫ বছর।
স্পেনের অন্যতম ভরসা ছিলেন মাত্র ১৯ বছর বয়সী লামিনে ইয়ামাল ও পাও কুবারসি। ২৪ বছর বয়সী নিকো উইলিয়ামস ফাইনালের জয়সূচক গোলের পাস বাড়িয়েছেন, আর ২৩ বছর বয়সী পেদ্রি পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে মাঝমাঠে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
আটলান্টায় কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর স্পেনকে নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। তবে পরের ম্যাচে সৌদি আরবকে সহজেই হারানোর পর গুয়াদালাহারায় উরুগুয়ের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয় তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে।
নকআউট পর্বে শেষ ৩২-এ অস্ট্রিয়াকে স্বচ্ছন্দে বিদায় করলেও কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পথে এবং পরবর্তী দুই ম্যাচে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে স্পেন। পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে শেষ সময়ে জোড়া ম্যাচে জয়সূচক গোল করেন মিকেল মেরিনো। সেই দুই গোলই স্পেনকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।
পুরো আসরে লামিনে ইয়ামালের গোলসংখ্যা ছিল মাত্র একটি, কোনো অ্যাসিস্টও ছিল না। তবু দলের কৌশলগত পরিকল্পনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি ম্যাচেই খেলেছেন তিনি। বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতেন এবং ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে স্পেনের প্রথম গোলের জন্য পেনাল্টি আদায় করেন।
গোলের দায়িত্বও কেবল একজনের কাঁধে ছিল না। মিকেল ওইয়ারসাবাল পাঁচ গোল করে দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। মিকেল মেরিনো ও পেদ্রো পোরো করেন দুটি করে গোল। আর ফাইনালে শিরোপা নিশ্চিত করা গোলটি আসে ফেরান তোরেসের পা থেকে।
ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে স্পেনের কৌশল ছিল নিখুঁত। দানি ওলমো, রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইসের মাঝমাঠ বলের দখল ধরে রেখে ম্যাচের গতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে কিলিয়ান এমবাপে ও মাইকেল অলিজেসহ ফরাসি আক্রমণভাগ কার্যকর হওয়ার সুযোগই পায়নি। প্রথমার্ধে এগিয়ে যাওয়ার পরও স্পেন আক্রমণাত্মক মানসিকতা বজায় রাখে এবং ফ্রান্সকে দূরপাল্লার শটেই সীমাবদ্ধ রাখে।
ফাইনালেও একই কৌশল অনুসরণ করে লা রোহা। বলের দখলে ছিল ৬৫ শতাংশ সময়। ১২০ মিনিটে আর্জেন্টিনা মাত্র দুটি শট নিতে পারে, যার একটিও লক্ষ্যে ছিল না। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণে নিখুঁত সংগঠনের কারণে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আক্রমণভাগ পুরোপুরি নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে হতাশা থেকে পাও কুবারসির ওপর দেরিতে ট্যাকল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফার্নান্দেজ। একজন বেশি খেলোয়াড় নিয়ে অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে চাপ আরও বাড়ায় স্পেন। শেষ পর্যন্ত ১০৬তম মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের বাড়ানো বলে জোরালো শটে জাল কাঁপিয়ে শিরোপা নিশ্চিত করেন ফেরান তোরেস।
ইউরোপ ও বিশ্ব-দুই শিরোপাই এখন স্পেনের দখলে। দলের অধিকাংশ খেলোয়াড় এখনো ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে পৌঁছাননি। ২০৩০ সালে নিজ দেশে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপ এবং আগামী ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপকে সামনে রেখে এই দলকে আরও পরিণত রূপে দেখা যাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৮ সাল পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন করা প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনেই স্পেনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে-এমন প্রত্যাশাই এখন দেশটির ফুটবল সমর্থকদের।