কয়রা থানায় পুলিশের সালিশ, বাড়ছে অপরাধের অভিযোগ

 প্রকাশ: ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৪৭ পূর্বাহ্ন   |   খুলনা

কয়রা থানায় পুলিশের সালিশ, বাড়ছে অপরাধের অভিযোগ

খুলনা ব্যুরো :

খুলনার কয়রা থানায় প্রতিদিনই জমি ও পারিবারিকসহ বিভিন্ন বিরোধ নিয়ে সালিশ-বৈঠক করছেন পুলিশের কর্মকর্তারা। থানার গোলঘর, মাঠ এমনকি অফিসকক্ষেও দুই পক্ষকে নিয়ে এসব বৈঠক হচ্ছে। এতে আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও অংশ নিচ্ছেন। তবে পুলিশের এ ধরনের সালিশ করার আইনগত এখতিয়ার নেই বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

গত ২২ আগস্ট শনিবার দুপুরে কয়রা উপজেলা সদরের ঈদগাহ মাঠে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সী মানুষের ভিড়। কেউ ব্যাগ, কেউ ফাইল হাতে নিয়ে দলবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মাঠের পাশে চায়ের দোকানের সামনে চেয়ার-টেবিল ও বেঞ্চে বসে দুই পক্ষের বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। ঈদগাহ মাঠের উল্টো দিকেই কয়রা থানার প্রধান ফটক।

থানার ভেতরে ঢুকে ডান দিকে গোলঘর। সেখানে এবং সামনের মাঠেও একই ধরনের সালিশ চলছিল। দুই পক্ষের আইনজীবীরা নিজেদের পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরছিলেন। থানার অফিসকক্ষেও ছিল মানুষের ভিড় ও হই-হট্টগোল। একটি সালিশ শেষ হওয়ার পরপরই আরেকটি বিরোধ নিয়ে বসছিলেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় প্রতিদিনই সালিশের জন্য মানুষ থানায় আসেন। কোনো কোনো বিরোধে সেদিনই সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, আবার কোনো পক্ষকে পরবর্তী দিনে আসতে বলা হয়। প্রতিটি পক্ষের সঙ্গে থাকেন আইনজীবী, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সার্ভেয়ারসহ ১০-১২ জন। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর পুলিশ কর্মকর্তারাই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন।

কয়রার বাসিন্দাদের অভিযোগ, অপরাধ দমনের চেয়ে সালিশ-বৈঠকেই পুলিশের ব্যস্ততা বেশি। এদিকে এলাকায় ইয়াবা, অনলাইন জুয়া ও চেতনানাশক ব্যবহার করে চুরির ঘটনা বেড়েছে।

কালনা বাজারের ব্যবসায়ী আনিছুর রহমানের বাড়িতে সম্প্রতি সিঁদ কেটে সাড়ে তিন লাখ টাকা চুরি হয়। তাঁর অভিযোগ, থানায় বিষয়টি জানালেও তিনি কোনো প্রতিকার পাননি।

গত ১৮ আগস্ট উলা গ্রামে মাছের ঘের দখল নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। স্থানীয় লোকজন থানায় একাধিকবার ফোন করলেও পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়নি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। পরে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। ততক্ষণে সংঘর্ষে সাতজন গুরুতর আহত হন। পরদিন আহত ব্যক্তিদের পক্ষে রবিউল ইসলাম মামলা করেন। তাঁর অভিযোগ, এরপরও পুলিশ এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

গত ১৫ মার্চ কয়রায় ১৫ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীকে বাড়ির সামনে থেকে অপহরণ করা হয়। এ ঘটনায় স্বজনেরা মামলা করেন। প্রায় ছয় মাস পার হলেও ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ পরিবারের। চলতি বছরে উপজেলায় দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। শিমলারাইট গ্রামের এছার আলী হত্যা মামলায় একজন আসামি কারাগারে রয়েছেন। তবে ওষুধ ব্যবসায়ী ভবতোষ মৃধা হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখনো উদ্‌ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।

২২ আগস্ট জমিসংক্রান্ত বিরোধের সালিশে থানায় এসেছিলেন পল্লীমঙ্গল গ্রামের বৃদ্ধ সবেদ আলী। তিনি বলেন, বিরোধের বিষয়ে এক মাসে চারবার তাঁকে থানায় আসতে হয়েছে। প্রতিবার যাতায়াত, আইনজীবীসহ তাঁর পাঁচ-ছয় হাজার টাকা করে খরচ হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো প্রতিকার পাননি।

একই দিন প্রতিবেশীর সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধের সালিশে এসেছিলেন শিরিনা খাতুন। সঙ্গে ছিলেন অসুস্থ বাবা। শিরিনার অভিযোগ, প্রতিপক্ষ প্রভাব খাটিয়ে সালিশে তাঁদের সঙ্গে অন্যায় করেছে।

একটি সালিশে অংশ নেওয়া আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মানুষ ডাকলে তাঁরা সেখানে যান। তবে এসব সালিশে লিখিত কোনো রায় দেওয়া হয় না। দুই পক্ষের আইনজীবীর মতামত শুনে পুলিশ কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত দেন। এসব সালিশের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়রা থানায় দিনে গড়ে সাতটি সালিশ হয়। শুক্র ও শনিবার এর সংখ্যা আরও বেশি। সালিশে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যাতায়াত, আইনজীবীর ফি ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতিটি সালিশে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা ব্যয় হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই খরচ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায়ও দাঁড়ায়। একাধিকবার থানায় আসতে হলে ব্যয় আরও বাড়ে।

আন্তর্জাতিক আইন সহায়তা কেন্দ্রের (আসক) জ্যেষ্ঠ সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবু বকর সিদ্দিক বলেন, পুলিশ সালিশে ব্যস্ত থাকায় এলাকায় অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। বর্তমানে মাদক ও চুরির ঘটনা বেড়েছে। নারী ও শিশু অপহরণের ঘটনাও ঘটছে। এসব বিষয়ে পুলিশের তৎপরতা প্রত্যাশিত নয়। অনেক আসামি পুলিশের সামনে ঘুরে বেড়ালেও তাঁদের আটক করা হয় না।

কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাশেদুল আলম বলেন, পুলিশ অপরাধ দমনে সব সময়ই তৎপর। তবে কয়রায় জমি নিয়ে বিরোধ বেশি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দুই পক্ষকে ডেকে বসতে হয়। এসব বৈঠকে দুই পক্ষের আইনজীবী ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা থাকেন। তাঁদের মতামতের ভিত্তিতে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করা হয়।

পুলিশের সালিশ করা যে পুলিশের কাজ নয়, তা স্বীকার করেন ওসি রাশেদুল আলম। তিনি বলেন, অপরাধ দমনে পুলিশকে কিছুটা কৌশলী হতে হয়। দুই পক্ষকে ডেকে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করাও সেই কৌশলের অংশ। এতে সমস্যা হলে সালিশি বৈঠক বন্ধ করে দেওয়া হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনা জেলা শাখার সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কুদরত ই খুদা বলেন, পুলিশের মূল দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধী গ্রেপ্তার ও অপরাধের তদন্ত করা। জমি নিয়ে বিরোধ বা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মানুষ পুলিশের কাছে আসে মূলত পুলিশের প্রতি ভয়ের কারণে। পুলিশের মধ্যে থাকা ভয়ের সংস্কৃতি দূর করা প্রয়োজন।

কুদরত ই খুদা আরও বলেন, থানার এসব সালিশকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণির দালালচক্র গড়ে ওঠে। তারা থানায় আসা মানুষকে ভুল বুঝিয়ে বা ভয় দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়।

খুলনা জেলা জজ আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোমরেজুল ইসলাম বলেন, জমি নিয়ে বিরোধ বা টাকাপয়সার লেনদেন নিয়ে সালিশ করার এখতিয়ার পুলিশের নেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার করে উভয় পক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। তবে জমি নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি আদালতের বিষয়। এ ধরনের বিরোধে পুলিশের সালিশ করা আইনসঙ্গত নয়।