গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার কমিশন বিল সংসদে, বিরোধী দলের ওয়াকআউট
ছবি-সংগৃহীতনিজস্ব প্রতিবেদক:
গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে ‘গুম প্রতিরোধ
ও প্রতিকার বিল-২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে গুমের
সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান
রাখা হয়েছে। একই দিনে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন আইন
প্রণয়নের লক্ষ্যে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল-২০২৬’ও সংসদে তোলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সংসদের বৈঠকে বিল দুটি আলাদাভাবে
উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং আইনমন্ত্রী মো.
আসাদুজ্জামান। পরে বিল দুটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংসদীয়
স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
তবে বিল দুটি উত্থাপনের আগে গণভোটের রায় পাশ কাটিয়ে সংস্কার
কার্যক্রম খণ্ডিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। এ
ধরনের প্রক্রিয়ার অংশ হতে চান না জানিয়ে তিনি বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নিয়ে
অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন।
গুমকে
স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধের প্রস্তাব
প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলে গুমকে মানবাধিকার,
মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের পরিপন্থী একটি স্বতন্ত্র,
আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা
হয়েছে।
বিলে গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি যাবজ্জীবন
কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে গুম প্রতিরোধ, দায়ী ব্যক্তিদের
বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ
ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার জন্য একটি সমন্বিত আইনি কাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
অভিযোগ তদন্ত সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান রাখা
হয়েছে। বিচারকার্যও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার প্রস্তাব রয়েছে। অভিযোগ
গঠনের পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে। বিশেষ কারণে তা সম্ভব না হলে
উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে আরও সর্বোচ্চ ৩০ কার্যদিবস সময় নেওয়া যাবে।
গুমের বিষয়ে মিথ্যা অভিযোগ করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম
কারাদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে।
অভিযুক্ত
বাহিনী তদন্ত করতে পারবে না
বিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা অন্য কোনো বাহিনীর
সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে দিয়ে সেই অভিযোগ তদন্ত না
করার বিধান রাখা হয়েছে।
কোনো পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে অথবা সরকার নিজ উদ্যোগে
অভিযুক্ত বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে
তদন্তভার দিতে পারবে।
এ ছাড়া কোনো অভিযোগের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
আইনের অধীনে বিচারযোগ্য অপরাধের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তদন্ত প্রতিবেদন ও সংগৃহীত
সাক্ষ্য-প্রমাণ চিফ প্রসিকিউটরের কাছে পাঠানোর বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন
মানবাধিকার কমিশন আইন
অন্যদিকে, ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন বাতিল করে
নতুন আইন করার লক্ষ্যে সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল-২০২৬’ উত্থাপন করা
হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে সুপারিশ
দেওয়ার জন্য একটি বাছাই কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। কমিটির সভাপতি হিসেবে থাকবেন
স্পিকার। এতে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি দল ও বিরোধী দল মনোনীত দুই সংসদ
সদস্য, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন মনোনীত একজন অধ্যাপকসহ
বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিনিধি রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একজন নাগরিক প্রতিনিধি এবং
নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে একজন প্রতিনিধিকে কমিটিতে রাখার কথা
বলা হয়েছে।
তবে প্রস্তাবিত বাছাই কমিটিতে সরকারি দলের প্রভাব বেশি থাকার
আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর ফলে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা
কতটা নিশ্চিত হবে, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
শৃঙ্খলা
বাহিনীর বিরুদ্ধে কমিশনের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
প্রস্তাবিত আইনে শৃঙ্খলা বাহিনী বা বাহিনীর কোনো সদস্যের
বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে কমিশন নিজ উদ্যোগে অথবা আবেদনের ভিত্তিতে
সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে।
প্রতিবেদনে কমিশন সন্তুষ্ট হলে পরবর্তী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া
হবে না। তবে সন্তুষ্ট না হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ
করতে পারবে কমিশন। সুপারিশ পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা
প্রতিষ্ঠানকে তাদের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে লিখিতভাবে কমিশনকে জানাতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশে শৃঙ্খলা বাহিনীর
বিরুদ্ধে অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তের যে ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল, সংসদে
উত্থাপিত নতুন বিলে তা রাখা হয়নি।
গণভোটের
রায় পাশ কাটানোর অভিযোগ
বিল দুটি উত্থাপনের আগে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন,
বর্তমান সংসদকে সাধারণ গতানুগতিক সংসদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জনগণের প্রত্যাশা
ছিল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
তিনি অভিযোগ করেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের যে মতামত প্রকাশ
পেয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়নি।
গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সংস্কার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশও যথাসময়ে বিল আকারে না আসায়
কার্যকারিতা হারিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীন
দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ব্যবস্থা, পুলিশ
সংস্কার ও নির্বাচন কমিশন—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ
সংস্কার ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
তার ভাষায়, খণ্ডিত সংস্কারের অংশ হতে তারা চান না। এ কারণে
বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদের ওই পর্ব থেকে ওয়াকআউট করছেন।
বিরোধীদের
ফিরে আসার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
বিরোধী দলের ওয়াকআউটের সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সালাহউদ্দিন আহমেদ তাদের সংসদে ফিরে এসে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার আহ্বান
জানান।
তিনি দাবি করেন, মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী
সরকারের অধ্যাদেশে কিছু ত্রুটি ছিল। দেশি-বিদেশি অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে
আন্তর্জাতিক মানের আইন প্রণয়নের লক্ষ্যেই নতুন বিল আনা হয়েছে।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলটিও বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা
করে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ নিয়েও
বিরোধী দলের অভিযোগের জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ওই আদেশের পেছনে
রাজনৈতিক সমঝোতা ছিল না এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এটি রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়াই
জারি করা হয়েছিল।
এদিকে,
গত ৩ আগস্ট গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া এবং ১০ আগস্ট জাতীয় মানবাধিকার
কমিশন আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। খসড়া দুটি অনুমোদনের পর থেকেই
মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল এর কয়েকটি বিধান নিয়ে উদ্বেগ ও সমালোচনা
জানিয়ে আসছে।