নেপালে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৪৬৯

 প্রকাশ: ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৩৪ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

নেপালে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৪৬৯

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

নেপালে আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। শুক্রবার দেশটির পুলিশ এ তথ্য জানিয়েছে। দুই দিন আগে হিমালয়সংলগ্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে পুরো গ্রাম ভেসে যাওয়ার পর নিখোঁজদের উদ্ধারে তৎপরতা চলছে।

ভারী যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত কুকুর নিয়ে উদ্ধারকারী দল কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খোঁজ করছে। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জীবিত কাউকে উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে। একই সঙ্গে নতুন করে বন্যার ঝুঁকি কমাতে কাজ করছেন কর্মকর্তারা।

নেপাল ও প্রতিবেশী তিব্বতে এখনো প্রায় ১ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। বুধবার সকালে হিমবাহ ধসে বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ি নদীপথ দিয়ে নেমে এলে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

বন্যার পানির স্রোত গ্রাম ও উপত্যকার ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও সেতু ধ্বংস করেছে। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর সঙ্গে তিব্বতের লাসাকে যুক্ত করা এই পথটি পর্যটক, পর্বতারোহী ও তীর্থযাত্রীদের কাছেও জনপ্রিয়। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি।

বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শহর ও উপত্যকাগুলোতে আটকে থাকা হাজারো মানুষের কাছে জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দিতে নেপালি কর্তৃপক্ষ হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে। সমতল এলাকায় বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া মরদেহ উদ্ধারে কাজ করছে জরুরি সেবাদানকারী দল। কোথাও কোথাও মরদেহের সন্ধানে প্রশিক্ষিত কুকুরও ব্যবহার করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া শহর থেকে উদ্ধার হওয়া শেষ দিকের কয়েকজনের একজন ছিলেন দিবগা তামাং। আরও তিনজনের সঙ্গে তাঁকে হেলিকপ্টারে করে নুওয়াকোটের একটি সেনাশিবিরে নেওয়া হয়।

তামাং বলেন, ‘আমাদের সব মানুষ চলে গেছে। তারা মারা গেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করার মতো আর কেউ নেই। সবকিছু, সবাই চলে গেছে। শেষ।’

নতুন বন্যার শঙ্কা

বন্যার পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় নতুন বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকায় ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষে ভোতেকোশি নদীর ওপর একটি হ্রদের মতো জলাধার তৈরি হয়েছে। পানির উচ্চতা বাড়ছে এবং বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সীমান্তের ওপারে চীন জানিয়েছে, আগামী তিন দিনে প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি-অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুলের সমান-ইতিমধ্যে ধ্বংসাবশেষে আটকে থাকা একটি হ্রদে প্রবেশ করতে পারে।

হ্রদটির বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আগামী ১ সেপ্টেম্বর পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জলবিদ্যা বিভাগের গবেষক ঝু জিনফেং রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভিকে বলেন, পানির পরিমাণ বাড়ছে, একই সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ছে।

সীমান্ত পারাপারের এলাকাও বিধ্বস্ত

চীনের দিকের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা গিরং সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত উদ্ধারকারীরা পৌঁছাতে পারেননি। গুরুত্বপূর্ণ ওই এলাকায় যাওয়ার প্রধান সড়ক থেকে ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চলছিল।

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড নেটওয়ার্কে গিরং সীমান্তবন্দরটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে চীনের যোগাযোগের এই পথে গত এক দশকে লজিস্টিকস জোন ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

বুধবার ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, কাদামিশ্রিত পানির বিশাল স্রোত ও ধ্বংসাবশেষ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সীমান্ত এলাকার স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পালানোর চেষ্টা করা মানুষও ওই স্রোতে আটকা পড়েন।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির হিসাবে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। চীনের অংশে এখন পর্যন্ত মাত্র তিনজনের মৃত্যুর বিষয় নিশ্চিত করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে চীনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর কর্মকর্তা ও প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং দুর্যোগকবলিত গিরং এলাকা পরিদর্শন করেন। তাঁর সফর থেকে বোঝা যায়, বেইজিং এই বিপর্যয়কে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে দেখছে।

‘বোমার মতো বিস্ফোরিত হয়ে এল’

বৃহস্পতিবার নেপালের দেবীঘাটে বন্যা থেকে বেঁচে যাওয়া জনক বাহাদুর বলেন, পানির স্রোত ‘হঠাৎ এসে বোমার মতো বিস্ফোরিত হয়েছিল’। তাঁর ভাষায়, দূর থেকে নদীটিকে ছোট মনে হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ পানি উপচে পড়ে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

নেপালে নিখোঁজ বিদেশিরা দুই ডজনেরও বেশি দেশের নাগরিক। ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ নেপালে সহায়তা ও উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সহায়তার প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এত শক্ত ও মজবুত ভবনকে চোখের সামনে কাঠির মতো ভেঙে যেতে আগে কেউ দেখেনি। যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা পাঠাচ্ছে এবং নেপালের নেতৃত্বকে জানানো হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করা হবে।

এদিকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিখোঁজ স্বজনদের খবরের অপেক্ষায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা।

মালয়েশিয়া থেকে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের একটি দলের সঙ্গে তিব্বতে যাওয়া ভেন্নিলা নামের এক নারীর বোন বাসন্তী মুনিয়ান্তি জানান, নেপাল থেকে তিব্বতে প্রবেশের পর বোনের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়।

তিনি বলেন, ‘আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছি। আমার বোন আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি চাই সে ফিরে আসুক। তাকে ছাড়া আমার আর কেউ নেই। শুধু চাই সে বাড়ি ফিরে আসুক, নিরাপদে থাকুক।’

চিতওয়ান জেলার প্রশাসক গণেশ আরিয়ালের হিসাবে, ওই জেলার নদীপথ থেকে ১০৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। চিতওয়ান সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ত্রিশূলি অঞ্চল থেকে সমতলের দিকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে।

স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে সব মরদেহ রাখার জায়গা না থাকায় জেলা প্রশাসন তাঁবু খাটিয়ে মরদেহ রাখার ব্যবস্থা করছে। স্বজনেরা যাতে এসে মরদেহ শনাক্ত ও গ্রহণ করতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার বন্যাকবলিত নুওয়াকোট পরিদর্শন করেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। তিনি বলেন, পরিস্থিতি এখনো কঠিন। রাষ্ট্রের সব সংস্থা পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে। প্রতিটি নাগরিকের জীবন রক্ষা, নিখোঁজদের সন্ধান ও উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে তাৎক্ষণিক সহায়তা দেওয়াই এখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।

পাঁচ মাস বয়সী শাহ সরকারের জন্য এই দুর্যোগ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলায় নেপালের সরকারি ব্যবস্থা ও কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পেও দেশটিতে প্রায় ৯ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল।