গাজায় ইসরায়েলপন্থী ফিলিস্তিনি মিলিশিয়াদের তাণ্ডব বাড়ছে
ছবি-সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
গাজায় ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অস্ত্র, অর্থ ও সামরিক সুরক্ষা পাওয়া ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর এসব গোষ্ঠীর লুটপাট, ভয়ভীতি সৃষ্টি এবং বেসামরিক মানুষকে হয়রানির অভিযোগ আবার সামনে এসেছে।
এই মিলিশিয়া প্রকল্পের সূত্রপাত ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরায়েলের রাফাহ অভিযান শুরুর সময়। সে সময় ‘পপুলার ফোর্সেস’ নামে একটি ছোট সশস্ত্র ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী দক্ষিণ গাজার ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তৎপরতা শুরু করে।
গোষ্ঠীটির নেতা ছিলেন ইয়াসের আবু শাবাব। তিনি বেদুইন আবু শাবাব গোত্রের সদস্য ছিলেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে চুরি ও মাদক পাচারের অভিযোগে হামাসের কারাগারে আটক থাকা অবস্থায় তিনি পালিয়ে যান।
গোষ্ঠীটিকে অস্ত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয় ২০২৫ সালের জুনে। তখন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেন, নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের পরামর্শে হামাসবিরোধী গাজাবাসী গোত্রগুলোকে সক্রিয় করা হয়েছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগে আবু শাবাবকে কয়েক মাস আগেই তাঁর তারাবিন গোত্র প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এক অভ্যন্তরীণ বিরোধে তিনি নিহত হন বলে তাঁর গোষ্ঠী জানায়। এরপর গাসসান দুহাইন পপুলার ফোর্সেসের নেতৃত্ব নেন।
আবু শাবাবের মৃত্যুর সময় আরও অন্তত তিনটি ইসরায়েল-সমর্থিত ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছিল। সব মিলিয়ে এসব গোষ্ঠীর সদস্যসংখ্যা কয়েক হাজার বলে ধারণা করা হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর গাজার যে প্রায় অর্ধেক এলাকা ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেখানে প্রতিটি গোষ্ঠী আলাদা এলাকায় সক্রিয়।
আরও গোষ্ঠীর উত্থান
‘কাউন্টার-টেররিজম স্ট্রাইক ফোর্স’ নামে আরেকটি হামাসবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী ২০২৫ সালের আগস্টে খান ইউনিসে গঠিত হয়। পপুলার ফোর্সেস থেকে বেরিয়ে হুসাম আল-আস্তাল এটি গড়ে তোলেন।
আল-আস্তাল আগে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা বাহিনীতে কাজ করেছেন। গবেষকদের মতে, ২০১৮ সালে মালয়েশিয়ায় মোসাদের একটি অভিযানের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়েছে। হামাস-পরবর্তী গাজা পরিচালনায় সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে অংশীদার করার কথাও তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন।
উত্তর গাজায় ‘পপুলার আর্মি’ বা ‘পপুলার আর্মি-নর্দার্ন ফোর্সেস’-এর নেতৃত্বে রয়েছেন আশরাফ আল-মানসি। বিভিন্ন গোষ্ঠী পর্যবেক্ষণকারী গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, এই বাহিনীর বড় অংশই সাবেক মাদক পাচারকারী।
গাজা সিটির পূর্বাঞ্চল শুজাইয়ায় ‘শুজাইয়া পপুলার ডিফেন্স ফোর্সেস’-এর নেতৃত্ব দেন রামি হিলেস। তাঁর নিজ সম্প্রসারিত গোত্রও প্রকাশ্যে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফিলিস্তিনি জাতীয় স্বার্থের প্রতি আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করেছে।
আল-আস্তাল বিভিন্ন সময়ে এসব গোষ্ঠীকে নিজের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করে ‘প্রজেক্ট নিউ গাজা’ নামে একটি পরিকল্পনার কথা বলেছেন। গবেষকদের মতে, এসব গোষ্ঠীর অধিকাংশ কমান্ডার ও সদস্য ফাতাহপন্থী। কয়েকজন আগে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা বাহিনীতেও কাজ করেছেন। কিছু যোদ্ধার সঙ্গে দায়েশ-ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্ক কিংবা মিসরের সিনাই হয়ে চলা চোরাচালানপথের পুরোনো যোগাযোগের কথাও গবেষণায় উঠে এসেছে।
অস্ত্র-অর্থ দিচ্ছে ইসরায়েল
ইসরায়েল এসব গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও অর্থ দেয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। হারেৎজের উদ্ধৃত কয়েকজন ইসরায়েলি সেনার বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় তাদের ড্রোন ও গোলন্দাজ সহায়তাও দেওয়া হয়।
এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে ওয়াশিংটন-সমর্থিত ‘গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন’-এর আর্থিক ও সরবরাহ ব্যবস্থার সম্পর্ক থাকার কথাও বলা হয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের শুরুর দিকে জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন ত্রাণব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে এই সহায়তা বিতরণ কাঠামো গড়ে তোলে।
ফিলিস্তিনি বাসিন্দা, ত্রাণকর্মী ও সাংবাদিকেরা এসব মিলিশিয়ার বিরুদ্ধে মানবিক সহায়তার বহর লুটের অভিযোগ করে আসছেন। কেরেম শালোম সীমান্তপথের কাছে একটি পরিবহন করিডোরে নিয়মিত লুটপাটের অভিযোগ এতটাই বেশি যে ত্রাণকর্মীরা জায়গাটিকে ‘লুটেরাদের গলি’ নামে ডাকেন।
রাফাহ দিয়ে যাতায়াতকারী মানুষকে হয়রানি ও চাঁদাবাজি, বাড়িঘরে হামলা, বাসিন্দাদের লক্ষ্য করে গুলি এবং নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সম্পত্তি পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
দেইর আল-বালাহ এলাকায় এক স্থানীয় মিলিশিয়া কমান্ডার হারেৎজকে জানান, তাঁর যোদ্ধারা সরাসরি বাসিন্দাদের কাছে ইসরায়েলি বাহিনীর দেওয়া বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ পৌঁছে দিয়েছেন।
হামাসের কঠোর দমন
হামাস এসব মিলিশিয়ার সদস্যদের বিশ্বাসঘাতক ও সহযোগী হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর যোদ্ধাদের হত্যা, আটক বা নিরস্ত্র করতে হামাসের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী ‘রাদা’ অভিযান চালিয়েছে। জাবালিয়া ও খান ইউনিসেও এমন অভিযান হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, গাজাবাসীর মধ্যে এসব গোষ্ঠীর জনসমর্থন এখনো দুর্বল। ভূখণ্ডটির বড় বড় গোত্র তাদের গ্রহণ করতে অনাগ্রহী এবং হামাসের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে চলেছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ) ১৫ মে জানায়, দেইর আল-বালাহর পূর্বাঞ্চলে ফিলিস্তিনি মিলিশিয়ারা আশ্রয়কেন্দ্রে ঢুকে পরিবারগুলোকে চলে যেতে বাধ্য করায় শত শত পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। একই পরিবারগুলোকে ফোন করে ইসরায়েলি বাহিনী পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরাও বাড়িঘর ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিল বলে তারা জানিয়েছে।
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ওসিএইচএর প্রধান জনাথন হুইটল এক বছর আগেই সতর্ক করেছিলেন, যুদ্ধের সময় ত্রাণ লুটের ‘প্রকৃত চুরি’ ঘটছে ইসরায়েলি বাহিনীর নজরদারির মধ্যে থাকা অপরাধী চক্রগুলোর মাধ্যমে। পরে তিনি স্পষ্ট করেন, এসব গোষ্ঠীর মধ্যে আবু শাবাবের বাহিনীও রয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মকর্তারাও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা বলেছেন। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘ তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরলিধর জুনে মানবাধিকার কাউন্সিলে বলেন, গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এমন এক পরিবেশে কাজ করছে, যা ইসরায়েল তৈরি করেছে। ফলে সাধারণ মানুষ একদিকে ইসরায়েলি বাহিনী, অন্যদিকে পৃথক এক ভয় ও নিপীড়নের মধ্যে আটকা পড়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক ফেব্রুয়ারিতে কাউন্সিলকে জানান, গাজা ও পশ্চিম তীরে হামাসসহ অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শাস্তিহীন নির্যাতনের একটি ‘ধারাবাহিক চিত্র’ তাঁর দপ্তরের নথিতে উঠে এসেছে। এসব গোষ্ঠী ইসরায়েলি বাহিনীর পাশাপাশি সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও তাদের দায়মুক্তি পাওয়াকে তিনি ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেন।
একই মাসে টুর্কের দপ্তরের পৃথক এক প্রতিবেদনে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে জাতিগত নিধনের আশঙ্কার কথাও বলা হয়। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনে সহায়ক অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে বিভিন্ন দেশের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।