সিলওয়ানে প্রত্নতত্ত্বও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিরোধের নতুন রেখা

 প্রকাশ: ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:২০ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

সিলওয়ানে প্রত্নতত্ত্বও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিরোধের নতুন রেখা ছবি-সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

পূর্ব জেরুজালেমের সিলওয়ান এলাকায় একটি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়ির নিচে প্রায় ২ হাজার বছরের পুরোনো একটি সমাধি কক্ষের সন্ধান পাওয়ার খবর নতুন করে প্রত্নতত্ত্ব, জমি ও বসতি নিয়ে বিতর্ক সামনে এনেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে ফিলিস্তিনিদের বসবাস ও নির্মাণের সুযোগ সীমিত করছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।

চলতি সপ্তাহে পারিবারিক বিরোধের ঘটনায় সন্দেহভাজনদের খুঁজতে ইসরায়েলি পুলিশ সিলওয়ানের একটি বাড়িতে প্রবেশ করে। সেখানেই মাটির নিচে সমাধি কক্ষটির সন্ধান পাওয়া যায় বলে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম, যার মধ্যে ‘দ্য জেরুজালেম পোস্টও’ রয়েছে, জানিয়েছে, ইসরায়েল অ্যান্টিকুইটিজ অথরিটি সমাধিটি দ্বিতীয় মন্দির যুগের বলে শনাক্ত করেছে। এই সময়কাল ৫১৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত। সমাধি কক্ষে ‘কোখিম’ নামে পরিচিত সরু কবরের খোপ রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

তবে সমাধির ওপর বসবাসকারী ফিলিস্তিনি পরিবারের জন্য আবিষ্কারটি স্বস্তির নয়। সিলওয়ানের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে বাড়িঘর ভাঙা, জমি বাজেয়াপ্ত, উচ্ছেদ এবং নির্মাণে বিধিনিষেধের অভিযোগ করে আসছেন।

২২ আগস্ট সিলওয়ানের আইন আল-লোজেহ এলাকায় দুই বিরোধী পরিবারের সংঘর্ষের তদন্তের সময় সমাধিটি আবিষ্কৃত হয় বলে জানা গেছে। ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সহিংসতায় তিন ফিলিস্তিনি নিহত হন। তাঁদের দুজন ইসরায়েলি পুলিশের গুলিতে এবং অপরজন, ইসাম আল-আওয়ার, আব্বাসি পরিবারের এক সদস্যের গুলিতে নিহত হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সিলওয়ানের বাসিন্দাদের কাছে সাম্প্রতিক এই সহিংসতা কয়েক দশক ধরে চলে আসা জমি, আবাসন, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং জেরুজালেমের ইতিহাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধেরই আরেকটি অধ্যায়।

প্রত্নতত্ত্ব ঘিরে নতুন বিতর্ক

জেরুজালেমবিষয়ক গবেষক, অধিকারকর্মী ও সিলওয়ানের বাসিন্দাদের মুখপাত্র ফাখরি আবু দিয়াবের অভিযোগ, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও তাদের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠন বহু বছর ধরে এলাকাটিকে ‘ভারীভাবে টার্গেট’ করছে।

তিনি জেরুজালেম সিটি করপোরেশন, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী সংগঠন, ইসরায়েল নেচার অ্যান্ড পার্কস অথরিটি এবং ইসরায়েল অ্যান্টিকুইটিজ অথরিটিকে এ কার্যক্রমে সক্রিয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেন।

আবু দিয়াব বলেন, এলাকাটিকে জেরুজালেমের প্রাচীনতম বসতির একটি স্থান হিসেবে দেখার কারণে সেখানে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে প্রাচীন ইহুদি পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

তাঁর দাবি, বসতি স্থাপনকারী সংগঠনগুলো এলাকায় বহু খননকাজ ও ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ তৈরি করেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই-এমন এলাকাতেও ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ভাঙা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সিলওয়ান পুরোনো জেরুজালেম শহরের ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত। ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন বেতসেলেমের হিসাবে, সেখানে প্রায় ২০ হাজার ফিলিস্তিনি বাস করেন। আল-আকসা মসজিদ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার কাছাকাছি হওয়ায় এলাকাটি ‘হোলি বেসিন’ নামে পরিচিত অঞ্চলের অংশ এবং জেরুজালেম নিয়ে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি দাবির কেন্দ্রে রয়েছে।

বেতসেলেমের মার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সিলওয়ানের প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে এমন পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতি নেওয়া হয়েছে, যা ফিলিস্তিনিদের উন্নয়ন সীমিত করছে এবং এলাকায় ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে।

আবু দিয়াব বলেন, পৌরকর দেওয়ার পরও ফিলিস্তিনি বাসিন্দারা অনুমোদিত পরিকল্পনা, নির্মাণের অনুমতি ও পৌরসেবার ঘাটতিতে ভুগছেন। অনুমতি না পাওয়ায় অনেক পরিবার নিজেদের জমিতে পুরোনো বাড়ি সম্প্রসারণ বা নতুন স্থাপনা নির্মাণে বাধ্য হয়। পরে সেগুলোকে অবৈধ নির্মাণ হিসেবে চিহ্নিত করে জরিমানা, আদালতের মামলা ও উচ্ছেদের আদেশ দেওয়া হয় বলে তাঁর অভিযোগ।

বাড়িঘর ভাঙার অভিযোগ

সিলওয়ানে ৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি স্থাপনা প্রশাসনিক বা আদালতের মাধ্যমে ভাঙার আদেশ পেয়েছে এবং শত শত বাড়ি ইতিমধ্যে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন আবু দিয়াব।

তিনি বলেন, ১৯৬৭ সালের আগেই নির্মিত কিছু বাড়িও ভাঙা হয়েছে। এসব বাড়ির ক্ষেত্রে নির্মাণ অনুমতি না থাকার যুক্তি প্রযোজ্য নয় বলেও দাবি তাঁর, কারণ সেগুলো ইসরায়েলি দখলের আগে নির্মিত হয়েছিল।

সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে সিলওয়ানের আল-বুস্তান এলাকায়। এর পাশে রয়েছে ‘সিটি অব ডেভিড’ নামের পর্যটন ও প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা, যা বসতি স্থাপনকারী সংগঠন এলাদের পরিচালনায় রয়েছে।

ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানগুলো এলাকাটিকে রাজা ডেভিডের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রাচীন বাইবেলীয় ভূদৃশ্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরে। বেতসেলেমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে জেরুজালেম পৌরসভা ‘কিংস গার্ডেন’ নামে একটি পর্যটন পার্ক তৈরির প্রস্তাব দেয়। এর আওতায় আল-বুস্তানের জমিতে জেরুজালেম ওয়ালস ন্যাশনাল পার্ক ও সিটি অব ডেভিড প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়।

আবু দিয়াবের হিসাবে, আল-বুস্তানে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ জন মানুষ ও ১১৫টি বাড়ি রয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৫৯টি বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং বাকি বাড়িগুলোও উচ্ছেদের আদেশ পেয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, এসব পরিকল্পনার লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের বাড়ি সরিয়ে সেখানে পার্ক ও গাড়ি রাখার জায়গা তৈরি করা।

বেতসেলেমের মার্চের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাতেন আল-হাওয়া এলাকায় ৩৩টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং আরও ৫৩টি পরিবার উচ্ছেদের ঝুঁকিতে রয়েছে। আল-বুস্তানে ৪৮টি বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং আরও ১২৩টি পরিবার উচ্ছেদের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।

ইতিহাসের বয়ান নিয়েও লড়াই

আবু দিয়াবের অভিযোগ, সিলওয়ানে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ শুধু নিদর্শন উদ্ধারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর মাধ্যমে এলাকার একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও চলছে।

তিনি দাবি করেন, কিছু এলাকায় খননের মাধ্যমে কানানীয়, রোমান, বাইজেন্টাইন এবং পরবর্তী ইসলামি যুগের পুরোনো নিদর্শন আড়াল বা পরিবর্তন করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে।

সিলওয়ানের বাসিন্দাদের এই প্রতিনিধির আরও অভিযোগ, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এলাকার ঐতিহাসিক বয়ান ও স্থানগুলোর নাম বদলে দিচ্ছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ব্যবহৃত কিছু রাস্তার নাম পরিবর্তন করে অন্য ঐতিহাসিক সময়ের সঙ্গে যুক্ত নাম দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

আবু দিয়াবের ভাষায়, এর উদ্দেশ্য হলো এলাকার আরব উপস্থিতি কমিয়ে সেখানে জাদুঘর ও ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ তৈরি করা, যা দর্শনার্থীদের ওপর নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ধারণা চাপিয়ে দিতে পারে।

ওয়াদি আল-রাবাবা এলাকায় পার্ক তৈরির জন্য পৌরসভা, প্রকৃতি কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য ইসরায়েলি সংস্থা প্রায় ৯৯ ডুনাম বা ৯৯ হাজার বর্গমিটার জমি বাজেয়াপ্ত করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

বেতসেলেম সিলওয়ানে এসব পদক্ষেপকে পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংগঠনটির মতে, পরিকল্পনা নীতি, আইন, আদালতের পদক্ষেপ, বসতি স্থাপনকারী সংগঠন এবং পৌরসভার সেবার ঘাটতি-সবকিছু মিলিয়েই এই প্রক্রিয়া চলছে।

তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এসব নীতিকে পরিকল্পিত উচ্ছেদের অভিযোগ হিসেবে মানে না। তাদের বক্তব্য, বাড়িঘর উচ্ছেদ বা অন্যান্য পদক্ষেপ পরিকল্পনা আইন, আদালতের রায় এবং জমির মালিকানা-সংক্রান্ত দাবির ভিত্তিতেই নেওয়া হয়।

আর সিলওয়ানের যে ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়ির নিচে নতুন সমাধিটির সন্ধান মিলেছে, তাদের ঘরেই এখন জেরুজালেমের জমি, ইতিহাস ও পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিনের সংঘাত যেন আরও সরাসরি এসে হাজির হয়েছে।