ম্লাদিচের মৃত্যুতে বসনিয়ার পুরোনো ক্ষত ফের দৃশ্যমান

 প্রকাশ: ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:২১ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ম্লাদিচের মৃত্যুতে বসনিয়ার পুরোনো ক্ষত ফের দৃশ্যমান ছবি-সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

সাবেক বসনিয়ান সার্ব সামরিক নেতা ও যুদ্ধাপরাধী রাতকো ম্লাদিচের মৃত্যু স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার বেঁচে থাকা ব্যক্তি কাছে তাঁর রেখে যাওয়া ক্ষতকে আরও একবার সামনে এনেছে। ১৯৯৫ সালের ওই হত্যাযজ্ঞে স্বজন হারানো মানুষের কাছে ম্লাদিচের মৃত্যু তাঁর অপরাধের উত্তরাধিকার বদলায়নি।

স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার স্মৃতিসৌধের কাছে বসবাস করেন মেইরা জোগাজ। ম্লাদিচের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর হাতে তাঁর তিন ছেলে, স্বামী ও নাতি নিহত হন। স্মৃতিসৌধজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজারো সাদা মার্বেলের সমাধিফলক প্রতিদিন তাঁকে সেই হত্যাযজ্ঞের কথা মনে করিয়ে দেয়।

৭৭ বছর বয়সী জোগাজ এএফপিকে বলেন, ম্লাদিচের কারণেই তিনি একা হয়ে গেছেন। শুধু তিনি নন, স্রেব্রেনিৎসার সব মা এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার আরও বহু মানুষ একই পরিণতির শিকার হয়েছেন।

বসনিয়ার ১৯৯০-এর দশকের যুদ্ধকালীন গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ম্লাদিচ নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন। বৃহস্পতিবার হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। দণ্ডিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তিনি ‘বসনিয়ার কসাই’ নামে পরিচিতি পান।

যুদ্ধের কয়েক দশক পরও জোগাজ নিজ গ্রামে ফিরে যেতে ভয় পান। যুদ্ধকালীন হত্যাকাণ্ডে গ্রামটি প্রায় জনশূন্য হয়ে গেছে। তাই তিনি স্মৃতিসৌধের হাঁটা দূরত্বে বন্ধুদের সঙ্গে থাকেন, যাতে নিহত স্বজনদের কবর দেখতে পারেন।

ম্লাদিচ সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি আরও অনেক দিন বেঁচে থাকলে ভালো হতো, যাতে স্রেব্রেনিৎসার মায়েদের মতো আরও বেশি কষ্ট তাঁকে সহ্য করতে হতো।

‘তার আদর্শ এখনও বেঁচে আছে’

মৃত্যুর আগে কয়েক মাসে ম্লাদিচ একাধিকবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। স্রেব্রেনিৎসায় ৮ হাজারের বেশি মুসলিম পুরুষ ও কিশোরকে হত্যার ঘটনায় তাঁর ভূমিকা ছিল। তাঁদের মরদেহ গণকবরে ফেলে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে ভয়াবহ রক্তপাতের ঘটনাগুলোর একটি ছিল এই হত্যাযজ্ঞ।

স্রেব্রেনিৎসার মায়েদের প্রধান সংগঠনের সদস্য শেহিদা আবদুররহমানোভিচ বলেন, ম্লাদিচ কষ্ট পেয়ে মারা গেছেন—এটি নিহতদের স্বজনদের জন্য কিছুটা সান্ত্বনার। তবে তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তাঁর দণ্ডিত হওয়া এবং সাজা ভোগ করা।

গণহত্যার সময় নিখোঁজ হওয়া ভাইকে আর কখনো খুঁজে পাননি আবদুররহমানোভিচ। তিনি বলেন, ম্লাদিচের যাবজ্জীবন সাজা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর জীবন কার্যত শেষ হয়ে গিয়েছিল।

১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে ছেলে ও স্বামীকে হারানো ৭৪ বছর বয়সী ফাদিলা এফেনদিচ বলেন, ম্লাদিচের মৃত্যু তাঁকে আনন্দিতও করেনি, আবার বিশেষভাবে দুঃখিতও করেনি।

তাঁর কাছে সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, ম্লাদিচের রাজনৈতিক ও জাতিগত আদর্শের মৃত্যু হয়নি। তিনি বলেন, ওই আদর্শ বিলীন হয়ে গেলে তিনি খুশি হতে পারতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই মতাদর্শ এখনও টিকে আছে।

সার্ব এলাকায় ম্লাদিচকে নিয়ে শ্রদ্ধা

সার্বিয়ার কিছু এলাকা এবং বসনিয়ার সার্ব-নিয়ন্ত্রিত অংশ রিপাবলিকা সার্পস্কায় এখনও ম্লাদিচকে নায়ক হিসেবে দেখা হয়। তাঁর মৃত্যুর পর রাতেই সেখানে শোকসভা ও স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

সার্বিয়া সীমান্তের কাছে জভোরনিক শহরে শত শত মানুষ রাস্তায় মিছিল করে ম্লাদিচের নাম ধরে স্লোগান দেয়। তাদের হাতে ছিল সার্বিয়া ও রিপাবলিকা সার্পস্কার সেনাবাহিনীর পতাকা এবং ম্লাদিচের ছবি-সংবলিত ব্যানার।

১৯৯২ সালে হাজারো বসনীয় মুসলিম হত্যার শিকার হওয়া ভিশেগ্রাদ শহরেও একদল তরুণ সেতুতে ম্লাদিচের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো একটি ব্যানার টাঙিয়ে মশাল জ্বালায়।

সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে সরকারপন্থী বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ইনফরমার ম্লাদিচকে নিয়ে টানা অনুষ্ঠান প্রচার করে। তাদের প্রচারিত ফুটেজে শহরের প্রধান একটি সেতুতে কয়েক ডজন মানুষকে মশাল হাতে দেখা যায়।

তবে সার্বিয়ার সরকারি প্রতিক্রিয়া ছিল তুলনামূলক সংযত। প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার ভুচিচ শুক্রবার বলেন, ম্লাদিচের সমর্থকেরা তাঁর নাম ধরে স্লোগান দিলেও এটি গান বা উদ্‌যাপনের দিন নয়।

ভুচিচ বলেন, ম্লাদিচ যেন জীবনের শেষ সময়টুকু সার্বিয়ায় কাটাতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে তাঁরা সবকিছু করার চেষ্টা করেছিলেন। স্বাস্থ্যগত কারণে ম্লাদিচকে মুক্তি দেওয়ার আবেদন আদালত প্রত্যাখ্যান করেছিল। ভুচিচ ওই সিদ্ধান্তকে ‘নজিরবিহীন ও অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

সার্বিয়ার বিচারমন্ত্রী নেনাদ ভুইচ জানান, ম্লাদিচকে প্রাপ্য সব সামরিক ও রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া হবে। তবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য হবে কি না, সে বিষয়ে ভুচিচ নিশ্চিত করেননি।

তিনি বলেন, পরিবার চাইলে ম্লাদিচকে সার্বিয়ার ভূখণ্ডে সমাহিত করার ক্ষেত্রে সরকার মর্যাদাপূর্ণ ও যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। দ্য হেগ থেকে তাঁর মরদেহ কখন হস্তান্তর করা হবে, সে তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছে সার্বিয়ার কর্তৃপক্ষ।

তবে ম্লাদিচের সমর্থকেরা তাঁর উত্তরাধিকারকে যেভাবেই তুলে ধরুক, ইতিহাসে তাঁর অবস্থান বদলাবে না বলে মনে করেন স্রেব্রেনিৎসার মায়েদের সংগঠনের সদস্য আবদুররহমানোভিচ।

তাঁর ভাষায়, ইতিহাস তাঁকে নিঃসন্দেহে একজন যুদ্ধাপরাধী এবং ইতিহাসের অন্যতম নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে মনে রাখবে।