ইহুদি স্কলার ক্যাথলিক সংগঠনের প্রধান, শুরু ইহুদিবিদ্বেষী আক্রমণ

 প্রকাশ: ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৪৯ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ইহুদি স্কলার ক্যাথলিক সংগঠনের প্রধান, শুরু ইহুদিবিদ্বেষী আক্রমণ অ্যামি-জিল লেভিন। ছবি- সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইহুদি ধর্মাবলম্বী বাইবেল গবেষক অ্যামি-জিল লেভিনকে ক্যাথলিক বাইব্লিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকার প্রথম ইহুদি সভাপতি নির্বাচিত করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ইহুদিবিদ্বেষী আক্রমণ। সংগঠনটির ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ইহুদি গবেষক সভাপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

লেভিন ছোটবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের একটি প্রধানত ক্যাথলিক এলাকায় বড় হয়েছেন। শৈশবে এক সহপাঠী তাঁকে বলেছিল, ইহুদি হওয়ার কারণে যিশু খ্রিস্টকে হত্যার জন্য তিনি দায়ী। তাঁর মা অবশ্য তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, এমন ধারণা সত্য নয়।

ঘটনাটিতে ক্ষুব্ধ বা বিচ্ছিন্ন হয়ে না গিয়ে বরং খ্রিস্টান প্রতিবেশীদের বিশ্বাস সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয় লেভিনের মধ্যে। তিনি ক্যাথলিক ধর্মশিক্ষার একটি ক্লাসে অংশ নেওয়া শুরু করেন। সেই আগ্রহই পরে তাঁকে খ্রিস্টীয় ধর্মগ্রন্থের একজন বিশিষ্ট ইহুদি গবেষকে পরিণত করে।

দীর্ঘ একাডেমিক জীবনে লেভিন খ্রিস্টান ও ইহুদিদের পরস্পরের ধর্ম ও ঐতিহ্য বোঝার ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। বহু গির্জায় বক্তব্য দিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের যিশুর জীবন ও শিক্ষার প্রাচীন ইহুদি প্রেক্ষাপট পড়িয়েছেন এবং খ্রিস্টান গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে একাধিক বই লিখেছেন। এমনকি সহলেখকের সঙ্গে লেখা একটি বই তিনি ব্যক্তিগতভাবে পোপ ফ্রান্সিসের কাছেও তুলে দিয়েছিলেন।

চলতি মাসের শুরুতে লেভিনকে ক্যাথলিক বাইব্লিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচনের খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে নানা ধরনের মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকটি পোস্ট ও মন্তব্যে তাঁকে ‘খ্রিস্টানবিরোধী’ বলা হয়, অভিযোগ করা হয় তিনি ক্যাথলিক ধর্মকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ইহুদিদের যিশুকে গ্রহণ না করার বিষয় নিয়েও আক্রমণ করা হয়। কিছু মন্তব্যে ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্যও জুড়ে দেওয়া হয়।

সংগঠনটির সভাপতি পদে একজন অ-ক্যাথলিককে কেন বেছে নেওয়া হলো, এমন প্রশ্নও উঠেছে। তবে সমালোচনার বড় একটি অংশে সরাসরি ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদিবিদ্বেষ বাড়তে থাকার সময়েই এই ঘটনা সামনে এলো।

সমর্থকদের পাশে লেভিন

লেভিনের দীর্ঘদিনের খ্রিস্টান সহকর্মী ও সমর্থকেরা এসব আক্রমণে ক্ষুব্ধ। সংগঠনটির নির্বাহী বোর্ডের চেয়ারম্যান গ্রেগরি ই. স্টার্লিং এবং নির্বাহী পরিচালক আর্চি রাইট এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, সভাপতি পদে লেভিন নির্বাচিত হয়েছেন তাঁর ইহুদি পরিচয়ের কারণে নয়; বরং তিনি একজন অসাধারণ গবেষক এবং ক্যাথলিক-ইহুদি সংলাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

ক্যাথলিক বাইব্লিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনে ক্যাথলিক ও অ-ক্যাথলিক,দুই ধরনের গবেষকই রয়েছেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে বাইবেল গবেষণার মান উন্নত করাই সংগঠনটির অন্যতম লক্ষ্য। লেভিন কয়েক দশক ধরে সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত। সভাপতি হওয়ার প্রস্তাব পাওয়ার পর প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, বিষয়টি হয়তো গুরুতর নয়। পরে বুঝতে পারেন, তাঁকে সত্যিই দায়িত্বটির জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে।

সংগঠনটি বলেছে, এই সমালোচনা ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তাই আরও স্পষ্ট করে। অতীতের বেশ কয়েকজন সভাপতি লেভিনের সমর্থনে দেওয়া একটি বিবৃতিতেও স্বাক্ষর করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথলিক বিশপদের সম্মেলনের আন্তধর্মীয় সম্পর্কবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ও পেনসিলভানিয়ার স্ক্র্যানটনের বিশপ জোসেফ বামবেরা লেভিনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বাইবেল গবেষণার প্রকৃত আন্তধর্মীয় চরিত্র এবং ইহুদি-ক্যাথলিক সহযোগিতার দীর্ঘ ইতিহাসের জন্য লেভিনের নির্বাচন একটি যথার্থ স্বীকৃতি।

লেভিন অর্থোডক্স ইহুদি ধর্মের অনুসারী। তিনি যিশুকে ঈশ্বরের অবতার হিসেবে খ্রিস্টান বিশ্বাস গ্রহণ করেন না। তবে প্রাথমিক যুগের একজন রাব্বি শিক্ষক হিসেবে যিশুর প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে এবং তিনি মনে করেন, ইহুদি ও খ্রিস্টান, দুই সম্প্রদায়ই পরস্পরের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেভিন বলেন, ঘৃণা, অপমান, কুৎসা ও অন্যকে দানব হিসেবে তুলে ধরা কোনোভাবেই ধর্মপ্রচারের ভালো পদ্ধতি নয়। এসব আক্রমণ যে চার্চের শ্রেষ্ঠ আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে না, সেটিও তাঁকে আবার ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

লেভিন আরও বলেন, তিনি নিজেও ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন।

যিশুকে বোঝার জন্য ইহুদি প্রেক্ষাপট

লেভিনের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যিশুকে তুলে ধরতে গিয়ে ইহুদি ধর্মকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের প্রয়োজন নেই, এটি দেখানো। তাঁর ভাষায়, যিশুকে ভালোভাবে তুলে ধরার জন্য ইহুদিধর্মকে খারাপ হিসেবে দেখানোর দরকার নেই।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যিশু যেন কঠোর ইহুদি আইন ও পবিত্রতার ধারণার বিপরীতে করুণা ও গ্রহণযোগ্যতার শিক্ষা এনেছিলেন, এমন একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে। কিন্তু বাইবেলের বর্ণনায় দেখা যায়, যিশু ইহুদি আইনকে সমর্থন করেছেন এবং মানুষকে আবার পবিত্র অবস্থায় ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন।

লেভিনের মতে, যিশুর সুসমাচারের ঘটনাগুলো প্রাচীন ইহুদি পাঠকদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই পরিচিত ও অর্থবহ মনে হতো। তাঁর অলৌকিক কাজের সঙ্গে প্রাচীন ইসরায়েলের নবীদের কাহিনির মিল রয়েছে। শিশুকালে হত্যার উদ্দেশ্যে আসা এক অত্যাচারী শাসকের হাত থেকে যিশুর পালিয়ে বাঁচার ঘটনা মূসার কাহিনির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

একইভাবে, ঈশ্বর ও প্রতিবেশীকে ভালোবাসার সর্বশ্রেষ্ঠ আদেশের কথা বলার সময় যিশু নতুন কোনো শিক্ষা তৈরি করেননি; তিনি তোরাহ থেকে উদ্ধৃত করেছিলেন বলে জানান লেভিন।

ইহুদিবিদ্বেষের কারণ সম্পর্কে লেভিন বলেন, মানুষ বাবা-মা বা বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া ধারণা, ইন্টারনেটে পড়া তথ্য, ইসরায়েল সরকারের নির্দিষ্ট নীতিকে সব ইহুদির মতামতের সঙ্গে এক করে দেখা কিংবা গির্জায় শোনা সমস্যাযুক্ত ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও বক্তব্যের মাধ্যমে এমন মনোভাব গ্রহণ করতে পারে।

ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে ক্যাথলিক অবস্থান

ক্যাথলিক চার্চের ইতিহাসে ইহুদিবিদ্বেষের দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক অধ্যায় থাকলেও হলোকাস্টের পরের দশকগুলোতে ভ্যাটিকান একাধিকবার এর নিন্দা জানিয়েছে। ১৯৬০-এর দশকের দ্বিতীয় ভ্যাটিকান কাউন্সিল খ্রিস্টান ও ইহুদিদের অভিন্ন ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরে। যিশুর মৃত্যুর দায় কোনো ধরনের পার্থক্য না করে সব ইহুদির ওপর চাপানো যায় না বলেও কাউন্সিলটি ঘোষণা করে।

দীর্ঘদিনের পোপ দ্বিতীয় জন পল ইহুদিদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ইহুদিবিদ্বেষের কোনো যৌক্তিকতা নেই এবং এটি সম্পূর্ণ নিন্দনীয় বলে মন্তব্য করেছিলেন।

‘তিনি খ্রিস্টান মানুষ ও বাইবেলকে ভালোবাসেন’ লেভিন যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির ন্যাশভিলের ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউ টেস্টামেন্ট ও ইহুদি স্টাডিজের অধ্যাপক এমেরিটা। বর্তমানে তিনি কানেকটিকাটের হার্টফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ফর রিলিজিয়ন অ্যান্ড পিসে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন।

ক্যাথলিক বাইব্লিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে তাঁর দায়িত্বের মধ্যে থাকবে বাইবেল গবেষণায় উৎকর্ষ বাড়ানো এবং গবেষকদের কাজ ও প্রকাশনায় সহায়তা করা। গির্জায় বক্তব্য দেওয়া অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ক্যাথলিক বিশপদের সঙ্গে কাজ করে ধর্মীয় বিদ্যালয়ের পাঠ্যবই, ধর্মশিক্ষা ও ধর্মোপদেশে যেন ইহুদিবিদ্বেষী বার্তা না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে চান তিনি।

প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক, দুই সম্প্রদায়ের গবেষকদের কাছেই লেভিনের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কেন্টাকির অ্যাসবারি থিওলজিক্যাল সেমিনারির নিউ টেস্টামেন্ট বিশেষজ্ঞ বেন উইদারিংটন তৃতীয় তাঁর সঙ্গে লূকের সুসমাচারের ওপর একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছেন। ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান ও ইহুদি লেখকের যৌথভাবে লেখা সুসমাচারভিত্তিক ব্যাখ্যাগ্রন্থ হিসেবে এটিকে বিরল উদাহরণ বলে মনে করা হয়।

উইদারিংটনের ভাষায়, বিভিন্ন প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক মহলে লেভিন অত্যন্ত সম্মানিত। ন্যাশভিলের একটি কারাগারেও তিনি নিয়মিত বাইবেল ক্লাস নিয়েছেন।

“তিনি খ্রিস্টান মানুষ ও বাইবেলকে ভালোবাসেন,” বলেন উইদারিংটন। “যেটি তিনি ভালোবাসেন না, তা হলো মানুষ বাইবেল ব্যবহার করে অন্যদের, ইহুদিদেরও-আঘাত করুক।”