ইউক্রেনের অর্থনীতিতে চাপ বাড়াতে রাশিয়ার ব্যাপক হামলা
ছবি-সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইউক্রেনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পরিবহন অবকাঠামো লক্ষ্য করে রাতভর ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত চলা এ হামলাকে ইউক্রেনের অর্থনীতি দুর্বল করা এবং দেশটির চাপের মুখে থাকা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও ক্লান্ত করে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে চালানো হামলায় বেসামরিক এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিহত হয়েছেন অন্তত দুজন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৪ জন বলে জানিয়েছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।
কিয়েভে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, রাশিয়া আগে অস্ত্রের মজুত বাড়িয়ে পরে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন একসঙ্গে ছুড়ে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে সংখ্যার চাপে অকার্যকর করার কৌশল নিয়েছে।
ইউক্রেনের কাছে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয় যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি রয়েছে। এর সঙ্গে যুদ্ধের নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে যুক্ত হয়েছে রাশিয়ার দ্রুতগতির জেটচালিত ড্রোন।
রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন অভিযান শুরুর সাড়ে চার বছরের মাথায় দুই দেশই একে অপরের ভূখণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধসংশ্লিষ্ট স্থাপনা লক্ষ্য করার দাবি মস্কোর
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবার রাত নামার পর ইউক্রেনের নয়টি শহরে ‘ব্যাপক’ হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধসংশ্লিষ্ট স্থাপনা-শিল্পকারখানা, তেল শোধনাগার, সরবরাহকেন্দ্র ও বন্দর অবকাঠামো।
তবে আবাসিক ভবনসহ বেসামরিক এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মতে, দক্ষিণাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া এলাকায় ৭৮ বছর বয়সী এক নারী এবং উত্তরাঞ্চলীয় খারকিভ এলাকায় আরও একজন নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৪ জন আহত হয়েছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, রাশিয়া ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও যুদ্ধ সম্প্রসারণে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। ফলে পাল্টা প্রতিরোধের ব্যবস্থাও বাড়াতে হবে।
চলতি সপ্তাহে ইউরোপীয় দেশগুলো অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা উল্লেখ করে জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোর অস্ত্র কেনার মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা যোগ করা জরুরি।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শুধু যুদ্ধসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলার দাবি করলেও ইউক্রেনের অভিযোগ, দীর্ঘপাল্লার ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার ওপর হামলার কারণে মস্কোর অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হওয়ার পর রাশিয়া ইউক্রেনের ব্যবসা ও অর্থনীতিতে আঘাত হানতে চাইছে।
রুশ ড্রোনের হামলায় ইউক্রেনের তিনটি বড় পণ্য বিতরণকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি খেলনা বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের গুদাম এবং একটি মিষ্টান্ন কোম্পানির ডিপো ধ্বংস হয়েছে। একটি ইলেকট্রনিকস বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বিতরণকেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো জানিয়েছে।
শীতের আগে বিদ্যুৎব্যবস্থায় হামলা
শীতের তীব্রতা বাড়ার আগেই ইউক্রেনের বিদ্যুৎব্যবস্থা দুর্বল করার চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছে রাশিয়া।
দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন অঞ্চলের একটি বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপাদনকেন্দ্রে চারটি শক্তিশালী গ্লাইড বোমা হামলা চালানো হয়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্রপাতি ধ্বংস হয়ে কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায় বলে জানিয়েছে এর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নাফতোগাজ।
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির প্রতিবেশী মলদোভা সফরের কথা ছিল বৃহস্পতিবার। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা ঘোষণার বার্ষিকী উপলক্ষে মলদোভার জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা তাঁর।
ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে, এমন আশঙ্কায় পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব দেশের আকাশসীমায় ড্রোন প্রবেশের ঘটনাও সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
মলদোভার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে পাঁচটি ড্রোন তাদের আকাশসীমায় ঢুকেছিল। তবে ড্রোনগুলো কে পাঠিয়েছিল, তা তারা জানায়নি।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সাতটি রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত বা নিষ্ক্রিয় করেছে। তবে কীভাবে এগুলো ঠেকানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
কিয়েভের চারটি জেলায় রাতের হামলায় আবাসিক ভবন, একটি স্কুল ও একটি চিকিৎসাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সেখানে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে নগর পুলিশ।
ওদেসায় সাত ঘণ্টার বেশি হামলা
মধ্য ইউক্রেনের পোলতাভা অঞ্চলে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে রুশ বাহিনী হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসনের প্রধান ভিতালি দিয়াকিভনিচ।
দক্ষিণাঞ্চলীয় ওদেসা অঞ্চলেও সাত ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসনের প্রধান ওলেহ কিপের।
হামলায় ১৬ তলা একটি আবাসিক ভবন, দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং একটি শস্য সংরক্ষণকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনের শস্য ও অন্যান্য কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ওদেসা।
হামলার পর ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে প্রতিষ্ঠান উক্রজালিজনিতসিয়ার কয়েকটি ট্রেন ১৭ ঘণ্টার বেশি দেরিতে চলেছে।
রুশ অনলাইন বাণিজ্যেও ইউক্রেনের হামলা
অন্যদিকে রাশিয়ার ভেতরেও প্রায় প্রতি রাতেই শত শত দীর্ঘপাল্লার ড্রোন দিয়ে হামলা চালাচ্ছে ইউক্রেন।
ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে, বিমান থেকে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দোনেৎস্ক শহরের কাছে রাশিয়ার প্রধান ও বিকল্প কমান্ড পোস্টে হামলা চালানো হয়েছে। ওই এলাকায় রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রার মুখে ইউক্রেনীয় সেনারা চাপের মধ্যে রয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১৪টি রুশ অঞ্চলের পাশাপাশি অবৈধভাবে সংযুক্ত ক্রিমিয়া, আজভ সাগর ও কৃষ্ণসাগরের ওপর ২৬৭টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ওয়াইল্ডবেরিজের বিশাল গুদামে হামলার পর এবার দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ওজোনের স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করছে ইউক্রেনীয় ড্রোন।
ওজোন প্রথমে জানিয়েছিল, ওরেনবুর্গ ও উফা শহরে তাদের দুটি সরবরাহকেন্দ্রে হামলা হয়েছে। তবে কোনো স্থাপনে আগুন লাগেনি। পরে কোম্পানিটি বিবৃতি সংশোধন করে জানায়, কেবল উফার স্থাপনাটিই হামলার শিকার হয়েছে। ওরেনবুর্গের কেন্দ্রটি সতর্কতার কারণে খালি করা হয়েছিল, পরে সেখানে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়।