হরমুজ প্রণালি খুলতে জোর কূটনৈতিক তৎপরতায়

 প্রকাশ: ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৩২ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

হরমুজ প্রণালি খুলতে জোর কূটনৈতিক তৎপরতায় ছবি-সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইরান যুদ্ধ ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতায় এবার হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। মধ্যস্থতাকারীদের অনুরোধের পর প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে নিজেদের শর্তের তালিকা তৈরিতে সম্মত হয়েছে তেহরান।

বৃহস্পতিবার ইরান সফরে গিয়ে দেশটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি। বৈঠকে আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌচলাচলের গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।

কাতার যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র এবং ইরানের প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশ। পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে কাতার গত জুনে একটি সমঝোতা স্মারক তৈরিতে মধ্যস্থতা করেছিল। ওই সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের কিছু শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল।

ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ এই জলপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হতো। ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর তেহরান হুমকি দেয়, তাদের অনুমতি ছাড়া প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী যেকোনো জাহাজে হামলা করা হতে পারে।

এর ফলে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যায় এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। এতে আলোচনায় ইরানের দর-কষাকষির ক্ষমতাও বাড়ে।

তেহরান সফরের পর কাতারের প্রধানমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি ‘আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান’ দেখানোর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

এরপর ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই জানান, মধ্যস্থতাকারীদের অনুরোধের পর হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে ইরান তার শর্তগুলোর একটি তালিকা প্রস্তুত করছে।

আল-মানার টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একজন দোভাষীর মাধ্যমে রেজাই বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য ওমানের সঙ্গে একটি করিডোর নিয়ে ইরানের সমঝোতা হয়েছে। এর কিছু অংশ ওমানের জলসীমা এবং কিছু অংশ ইরানের জলসীমার মধ্যে পড়বে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্ত মেনে চললে জাহাজগুলোকে নির্ধারিত একটি কেন্দ্রীয় নৌপথ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

এর আগে ইরানের দেওয়া শর্তগুলোর মধ্যে ছিল দেশটির বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। তবে এবার তেহরান এসব দাবিতে কোনো পরিবর্তন আনবে কি না, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হয়, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ। দুই দেশের পক্ষ থেকে মূলত কঠোর বক্তব্যই এসেছে। ফলে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোই আলোচনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইরান এখনো গত জুনের সমঝোতা স্মারকে ফিরে যাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। ওই সমঝোতায় ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমার মধ্যে যুদ্ধবিরতির কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে হরমুজে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের কর্তৃত্ব নিয়ে দুই পক্ষের ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণে চুক্তিটি দ্রুত ভেঙে পড়ে। স্বাক্ষরের তিন সপ্তাহ পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, সমঝোতাটি ‘শেষ’।

বুধবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস জানায়, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পরিচালনা এবং এর আয় ভাগাভাগি নিয়ে ইরান ও ওমান নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। তবে পরে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানান, দুই দেশ এখনো চুক্তির বিস্তারিত বিষয় নিয়ে কাজ করছে।

এদিকে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েক মাস আগে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের পাতা সমুদ্র মাইন হরমুজ প্রণালি থেকে সরিয়ে ফেলেছে মার্কিন বাহিনী।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক নৌপথগুলো খোলা এবং জাহাজ চলাচল বাড়ানোর গতি তৈরি হয়েছে।

কুপারের দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মার্কিন বাহিনী প্রায় ১ হাজার ৫০০ বাণিজ্যিক জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হতে সহায়তা করেছে। এসব জাহাজে প্রায় ৭৫ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বারবার দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি খোলা রয়েছে। তবে ইরানের হামলার হুমকির কারণে অনেক জাহাজই এই জলপথ দিয়ে চলাচল এড়িয়ে যাচ্ছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে, বর্তমানে প্রণালিতে স্বাভাবিক সময়ের মাত্র ৫ থেকে ১৫ শতাংশ জাহাজ চলাচল করছে।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে ৭০টি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৯ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।