নেতানিয়াহুর হিসাবেই আঞ্চলিক যুদ্ধের শঙ্কা বাড়ছে
ছবি-সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইসরায়েলি সামরিক হামলা ও অনুপ্রবেশ মধ্যপ্রাচ্যকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘে সিরিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি ইব্রাহিম ওলাবি। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ‘সংকীর্ণ নির্বাচনী হিসাব’ পুরো অঞ্চলকে এমন এক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে কেউই রেহাই পাবে না।
বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে দেওয়া বক্তব্যে ওলাবি বলেন, সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েল আটবার বিমান হামলা চালিয়েছে। সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলি অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। অপহরণ, গোলাবর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের ‘আগ্রাসী কর্মকাণ্ড ও লঙ্ঘন’ও থামেনি।
চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সিরিয়ার অংশে অবস্থিত মাউন্ট হারমনের ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থান পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি সেনাদের অনির্দিষ্টকাল অবস্থানের কথা বলেন। ওলাবি একে ‘আন্তর্জাতিক বৈধতা ও নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের প্রকাশ্য অবজ্ঞা’ বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, উত্তেজনা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সিরিয়া গুরুত্বের সঙ্গে অংশ নিচ্ছে। তবে ইসরায়েলের হামলা ও অনুপ্রবেশ অব্যাহত থাকলে কয়েক মাস ধরে চলা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শান্তি প্রচেষ্টা ভেস্তে যেতে পারে।
ওলাবির ভাষায়, ইসরায়েলের হামলা সিরিয়ার পথ বদলাতে পারবে না। স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে ইসরায়েলকে হামলা বন্ধ করতে হবে, সিরিয়ার ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ থামাতে হবে, ১৯৭৪ সালের বিচ্ছিন্নকরণ চুক্তি পুরোপুরি মেনে চলতে হবে এবং ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বরের পর দখল করা ভূখণ্ড থেকে সরে যেতে হবে।
অধিকৃত গোলান মালভূমির প্রসঙ্গও তোলেন ওলাবি। তিনি ১৯৮১ সালে গৃহীত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৪৯৭ নম্বর প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, অধিকৃত সিরীয় গোলানে ইসরায়েলের আইন, বিচারিক ক্ষমতা ও প্রশাসন প্রয়োগের সিদ্ধান্তের কোনো আন্তর্জাতিক আইনি বৈধতা নেই।
চলতি মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একটি প্রস্তাবেও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। এতে ১২৩টি দেশ সমর্থন দিয়েছে, যেখানে আগেরবার সমর্থন ছিল ৯৭ দেশের।
সিরিয়ার পরিবর্তিত পরিস্থিতির কথাও নিরাপত্তা পরিষদে তুলে ধরেন ওলাবি। তিনি চলতি মাসের তিনটি ঘটনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন-জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দামেস্ক সফর, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের সিরিয়া সফর এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসির সফর।
ওলাবির দাবি, গুতেরেসের সফরের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ ও সিরিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার অবসান হয়েছে এবং দুই পক্ষের সম্পর্কে নতুন অংশীদারত্বের সূচনা হয়েছে। শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের সফরকে তিনি বাস্তুচ্যুতি ও শরণার্থী সংকট থেকে দেশে ফেরার নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন। তাঁর হিসাবে, এরই মধ্যে ৩০ লাখের বেশি সিরীয় দেশে ফিরেছেন।
গ্রোসির সফরকে তিনি পরমাণু বিষয়ে ‘অস্পষ্টতার যুগ’ পেরিয়ে আরও বিস্তৃত সহযোগিতার নতুন পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র এ সপ্তাহে ৪৭ বছর পর সিরিয়াকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক দেশের তালিকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান ওলাবি।
রাশিয়া, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সিরিয়ার সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার কথাও জানান তিনি। সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) বিলুপ্তি ও সিরীয় আরব সেনাবাহিনীতে তাদের একীভূত হওয়ার বিষয়টিকে তিনি জাতীয় সংহতির প্রক্রিয়ার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, এই প্রক্রিয়া নাগরিকদের সমতার ভিত্তিতে এগোচ্ছে, সাম্প্রদায়িক কোটার ভিত্তিতে নয়।
সিরিয়ার অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর কিছু লক্ষণের কথাও বলেন ওলাবি। জার্মানির সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পুনরায় চালু হওয়া, নতুন ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ব্যবস্থা, অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন ঠেকানোর বৈশ্বিক সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের (এফএটিএফ) ‘ধূসর তালিকা’ থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি এবং দামেস্ক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা পুনরায় চালুর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, একটি সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়া বা ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ পাওয়া সিরীয়দের কাছে কেবল অর্থনৈতিক ঘটনা নয়; এগুলো দেশে স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসার লক্ষণ।
সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ, তাঁর ভাই মাহের আল-আসাদ এবং সাবেক সরকারের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে সিরীয় নাগরিকদের ওপর সংঘটিত অপরাধের মামলায় আদালতের রায়ের কথাও জানান ওলাবি। পলাতক এক সাবেক কর্মকর্তাকে সিরিয়ার কাছে হস্তান্তর করায় লেবাননের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
নিরাপত্তা পরিষদে সিরিয়ার মানবিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জাতিসংঘের ভারপ্রাপ্ত সহকারী মহাসচিব ও উপ-জরুরি ত্রাণ সমন্বয়কারী ইন্দ্রিকা রতওয়াত্তে বলেন, সিরিয়া এখন ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে’ রয়েছে।
তাঁর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ লাখ অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষ এবং ১৭ লাখের বেশি শরণার্থী আসাদ সরকারের পতনের পর দেশে ফিরেছেন। তবে দেশে ফিরে আসা মানেই মানবিক সংকটের অবসান নয়। এখনো ৫৫ লাখের বেশি মানুষ দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত, যাদের মধ্যে ৮ লাখ ৩৩ হাজারের মতো মানুষ ১ হাজার ২০০টির বেশি শিবিরে বসবাস করছেন।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে বিস্ফোরক ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের কারণে ২ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে নিহত হয়েছেন ৮৬৫ জন। সিরিয়ায় আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার আবেদনও এখন পর্যন্ত মাত্র ৩০ শতাংশ অর্থায়ন পেয়েছে।
রতওয়াত্তে বলেন, এই মুহূর্তে বিনিয়োগ করা গেলে সিরিয়ার ভঙ্গুর অগ্রগতিকে দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারে রূপ দেওয়া সম্ভব। তিনি দেশে ফেরা মানুষদের সহায়তা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং সিরিয়াকে আঞ্চলিক সংঘাতের বাইরে রাখার উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
সিরিয়ায় জাতিসংঘের উপ-রাজনৈতিক দূত ক্লদিও কর্দোনে দামেস্ক থেকে নিরাপত্তা পরিষদকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক দেশের তালিকা থেকে সিরিয়াকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায় জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সিরিয়ার অর্থনীতি দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে বলেও জানান তিনি।
তবে ব্যাপক দারিদ্র্য ও নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়ায় অধিকাংশ সিরীয়র জীবনযাত্রা এখনো কঠিন বলে সতর্ক করেন কর্দোনে।
দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, সেখানে বারবার স্থল অনুপ্রবেশ, বাড়িতে তল্লাশি এবং ব্যক্তিগত ও কৃষিজ সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনা ঘটছে। যুদ্ধবিরতি রেখার পূর্বদিকে ইসরায়েলের অবস্থান সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
১৮ আগস্ট ইদলিব প্রদেশের আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানান কর্দোনে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে জর্ডানে ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ও আলোচনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার উদ্যোগকে স্বাগত জানান তিনি।
সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন কর্দোনে। হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ও নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ করে তিনি সিরীয় কর্তৃপক্ষকে সব ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়ার আহ্বান জানান।