ইসরায়েলপন্থী লবির অর্থবলে মার্কিন ভোটে চাপ

 প্রকাশ: ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৫৮ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলপন্থী লবির অর্থবলে মার্কিন ভোটে চাপ ছবি-সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অন্য যেকোনো বহিরাগত গোষ্ঠীর চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করছে দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী লবি। তবে বিপুল অর্থ ঢালার পাশাপাশি গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও বাড়ছে বিরোধিতা।

আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপিএসি) তাদের প্রধান নির্বাচনী ব্যয় কাঠামো ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্টের (ইউডিপি) মাধ্যমে দেশজুড়ে বিভিন্ন নির্বাচনী লড়াইয়ে কোটি কোটি ডলার ঢালছে।

নির্বাচনী অর্থায়ন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ওপেনসিক্রেটসের হিসাবে, তথাকথিত ‘সুপার পিএসি’ ইউডিপি কংগ্রেসের বিভিন্ন নির্বাচনে এখন পর্যন্ত ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। প্রার্থীদের কাছ থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করার শর্তে এ ধরনের সুপার পিএসি নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারে সীমাহীন অর্থ ব্যয় করতে পারে।

ওপেনসিক্রেটস বলছে, চলতি নির্বাচনী চক্রে ইউডিপিই সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয়কারী বহিরাগত সংগঠন। আর পুরো ইসরায়েলপন্থী দাতা নেটওয়ার্ক ব্যয় করেছে ৭ কোটি ১০ লাখ ডলার, যা কেবল ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

এই বিপুল অর্থ এআইপিএসির ওয়াশিংটনকেন্দ্রিক প্রভাব এখনো কতটা শক্তিশালী, তারই ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে ইসরায়েল বিষয়ে মার্কিন নীতি এবং দেশটির নির্বাচনে ধনী স্বার্থগোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নিয়ে বাড়তে থাকা ক্ষোভও সামনে আনছে।

এআইপিএসি তাদের অর্থের বড় অংশ ব্যয় করেছে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে। ইসরায়েলের প্রতি দৃঢ় সমর্থন রয়েছে এমন প্রার্থীদের এগিয়ে দেওয়া এবং ইসরায়েলকে নিঃশর্ত মার্কিন সামরিক সহায়তার সমালোচকদের ঠেকানোই ছিল এসব ব্যয়ের অন্যতম লক্ষ্য।

এআইপিএসি এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। তবে সংগঠনটি এর আগে তাদের প্রভাব কমে যাওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের সমর্থন পাওয়া শত শত প্রার্থী প্রাথমিক নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন।চলতি বছর এআইপিএসির অর্থায়নে কিছু বড় জয় এসেছে। তবে ব্যর্থতার পেছনেও গেছে বিপুল অর্থ।

অর্থের বিপরীতে প্রতিরোধ

মিশিগানে সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও প্রগতিশীল রাজনীতিক আবদুল এল-সাইয়েদের ডেমোক্রেটিক সিনেট মনোনয়ন ঠেকাতে এআইপিএসি ও তাদের মিত্র সংগঠনগুলো প্রায় ৩ কোটি ডলার ব্যয় করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের সমর্থন পাওয়া কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে হারিয়ে মনোনয়ন জিতে নেন এল-সায়েদ।

ক্যালিফোর্নিয়া, ইলিনয় ও নিউইয়র্কের কয়েকটি কংগ্রেস নির্বাচনে এআইপিএসি-সংশ্লিষ্ট অর্থ পাওয়া প্রার্থীদেরও হারিয়েছেন প্রগতিশীল প্রার্থীরা। এসব নির্বাচনে এআইপিএসির বিপুল অর্থ ব্যয় নিজেই প্রচারের একটি ইস্যুতে পরিণত হয়।

মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কাজ করা কুইন্সি ইনস্টিটিউটের এলি ক্লিফটন বলেন, মিশিগানে ইউডিপিই সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে। তবে সংগঠনটির বড় অনুদানের ৯৭ শতাংশ এসেছে ওই অঙ্গরাজ্যের বাইরে থেকে। তাদের সবচেয়ে বড় দাতাদের মধ্যে রয়েছেন রিপাবলিকান ধনকুবেররা।

ক্লিফটনের ভাষায়, এটি এমন একটি স্বার্থগোষ্ঠী, যারা দলীয় বিভাজনের বাইরে থেকে কাজ করে এবং মূলত একটি বিদেশি দেশের স্বার্থ এগিয়ে নিতে সক্রিয়।

এআইপিএসিকে ঘিরে অস্বস্তি এখন আর শুধু ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।

মিশিগানে রিপাবলিকান দলের সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সের ঘনিষ্ঠরা সম্প্রতি এআইপিএসিকে প্রকাশ্যে তাঁর পক্ষে বিজ্ঞাপন না চালানোর অনুরোধ করেছেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এআইপিএসির প্রকাশ্য তৎপরতা আরব-আমেরিকান অধ্যুষিত ওই এলাকায় এল-সায়েদকে বরং সুবিধা দিতে পারে।

ইসরায়েল নিয়ে বদলাচ্ছে মার্কিন জনমত

এই অস্বস্তির পেছনে রয়েছে ইসরায়েল বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনমতের বৃহত্তর পরিবর্তন। গাজায় দীর্ঘ যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর ইসরায়েলকে নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের মনোভাব বদলেছে।

জুনে কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির এক জরিপে ৪৮ শতাংশ মার্কিন ভোটার বলেছেন, ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই হার ৬৬ শতাংশ। জরিপটির নয় বছরের ইতিহাসে সামগ্রিকভাবে এটিই সর্বোচ্চ হার।

ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশে এই পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্ট। সেখানে প্রার্থীরা ক্রমেই এআইপিএসিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ এবং সাধারণ ভোটারের ওপর বড় অর্থের স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন।

তবে সমালোচনা শুধু ডেমোক্র্যাটদের বামপন্থী অংশেই সীমিত নেই। ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিতেও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ঘরানার কিছু রক্ষণশীল ওয়াশিংটনের ইসরায়েলপন্থী নীতির সমালোচনা করছেন। তাঁদের কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রকে আরও গভীরভাবে বিদেশি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার জন্য ইসরায়েলপন্থী লবির ভূমিকারও সমালোচনা করছেন। 

এর মধ্যেও এআইপিএসির অর্থনৈতিক শক্তি বাড়ছে। ওপেনসিক্রেটসের হিসাবে, এআইপিএসি নিজেই ইউডিপিকে ৩ কোটি ডলার দিয়েছে।

কংগ্রেসে ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার পক্ষে এখনো ব্যাপক সমর্থন থাকায় সংগঠনটির রাজনৈতিক প্রভাবও শক্তিশালী।

তবে এবারের প্রাথমিক নির্বাচনগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ব্যয় করলেই জয় নিশ্চিত হয় না। এমনকি একসময় যে সমর্থন প্রার্থীদের কাছে ছিল অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত, কিছু নির্বাচনী এলাকায় এখন সেটিই এমন একটি বিষয় হয়ে উঠছে, যা নিয়ে প্রার্থীরা চান তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বীরাই বেশি কথা বলুক।

এএফপিকে ট্র্যাক এআইপিএসি অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের সহপ্রতিষ্ঠাতা কেসি কেনেডি বলেন, এ কারণেই এআইপিএসির বিজ্ঞাপনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও ইসরায়েল প্রসঙ্গ প্রায় থাকেই না।

তাঁর দাবি, ভোটারদের কাছে এআইপিএসি এখন ‘বিষাক্ত’ একটি নাম। আর সংগঠনটি যত বেশি অর্থ ব্যয় করছে, রাজনৈতিক বর্ণমালা নির্বিশেষে ভোটারদের কাছে তাদের নেতিবাচক ভাবমূর্তিও তত বাড়ছে।