যুদ্ধ দারিদ্র্যে ইয়েমেনে স্কুলছুট হচ্ছে শিশুরা
ছবি-সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও দক্ষিণ ইয়েমেনের চারটি জেলার জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিশু স্কুলের বাইরে রয়েছে। সংঘাত, দারিদ্র্য, খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং কমে যাওয়া বৈদেশিক সহায়তা শিশুদের পড়াশোনা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন।
এডেন, লাহজ ও তাইজ গভর্নরেটের চারটি জেলায় ২ হাজার ২১৪টি পরিবারের ওপর চালানো জরিপে দেখা গেছে, ৩২ শতাংশ শিশু কখনোই স্কুলে ভর্তি হয়নি। আরও এক-চতুর্থাংশ শিশু পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে এবং তাদের দ্রুত স্কুলে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা প্রয়োজন।
বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পরিস্থিতি আরও কঠিন। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরিবার নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
সেভ দ্য চিলড্রেনের এই মূল্যায়নে প্রায় ১৪ হাজার মানুষের তথ্য নেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় ৫ হাজার শিশু। এতে দেখা গেছে, খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়া, বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্যের কারণে আরও বেশি শিশু শ্রেণিকক্ষের বাইরে চলে যাচ্ছে।
জাতিসংঘের ইয়েমেন মানবিক সহায়তা পরিকল্পনার হিসাবে, দেশটির ৬৬ লাখ শিশু-মোট শিশু জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ-স্কুলের বাইরে রয়েছে।
বাঁচতে কাজে যাচ্ছে শিশুরা
অনেক পরিবারের কাছে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। জরিপে শনাক্ত স্কুলছুটের প্রায় পাঁচটির মধ্যে একটি ঘটনা শিশুশ্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পরিবারের টিকে থাকার জন্য শিশুরাই কাজে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৯২ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, পরবর্তী খাবার কোথা থেকে আসবে তা তারা জানে না। ৯৫ শতাংশ পরিবার বলেছে, তাদের আয়ের প্রধান উৎস দৈনিক মজুরি।
এ ছাড়া ৮৪ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, স্কুলের পোশাক, বই ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের খরচ বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের হিসাবে, ইয়েমেনে ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত। গ্রামীণ এলাকায় এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৪ শতাংশে।
শিশুরা ভাঙারি ধাতু সংগ্রহ, নির্মাণকাজ কিংবা জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের মতো কাজে যুক্ত হচ্ছে। এসব কাজে দুর্ঘটনা, শোষণ এবং স্কুল থেকে আরও দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এক দশকের সংঘাতের চাপ
বছরের পর বছর সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট ও জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ের কারণে ইয়েমেনের পরিবারগুলোর ওপর চাপ ক্রমেই বেড়েছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, দেশটির ২ কোটি ২৩ লাখের বেশি মানুষ, মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ-মানবিক সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে। তাদের মধ্যে ১ কোটি ২২ লাখ শিশু।
অন্যদিকে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমও তীব্র অর্থসংকটে রয়েছে। গত বছর ইয়েমেনের জন্য জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনার প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ২৫ শতাংশ পাওয়া গেছে। ফলে বিভিন্ন কর্মসূচি সীমিত করতে হয়েছে বা বন্ধ হয়ে গেছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং বাণিজ্যিক জাহাজ পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
শিশুরা স্কুলে যাওয়ার সামর্থ্য পেলেও অনেক ক্ষেত্রে স্কুলগুলো আর নিরাপদ বা ব্যবহারযোগ্য নেই।
ইয়েমেনে ২ হাজার ৩৭৫টির বেশি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত, ধ্বংস কিংবা সামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়েছে অথবা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এতে শিশুদের নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ ব্যাহত হচ্ছে।
স্কুলে যাওয়া-আসার পথেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
‘হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মের’ ঝুঁকি
ইয়েমেনে সেভ দ্য চিলড্রেনের কান্ট্রি ডিরেক্টর রিশানা হানিফা বলেন, দেশটির শিশুরা ‘হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
তিনি বলেন, সংকট তীব্র হওয়ায় শিশুরা শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশে চলে যাচ্ছে। যত বেশি সময় তারা স্কুলের বাইরে থাকবে, তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা তত কমবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে এক দশকের বেশি সংঘাতের পর ইয়েমেনের পুনর্গঠনের সক্ষমতার ওপর।
হানিফার মতে, মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে শিক্ষাকে গৌণ বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। সংঘাতের সময় মানুষের দৈনন্দিন টিকে থাকার লড়াই এতটাই তীব্র হয় যে শিক্ষার গুরুত্ব অনেক সময় আড়ালে চলে যায়।
তিনি বলেন, শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; বিশ্বের প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। পরিবারগুলো যাতে টিকে থাকতে পারে এবং সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারে, সে জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিরাপদ ও সবার জন্য উন্মুক্ত শিক্ষার সুযোগ ফিরিয়ে আনতে কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
সৌদি আরবের শিক্ষা প্রকল্প
মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানালেও ইয়েমেনে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সরকারি সেবা শক্তিশালী করতে উন্নয়ন ও শিক্ষা প্রকল্প বাড়িয়েছে সৌদি আরব।
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সৌদি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন প্রোগ্রাম ফর ইয়েমেন সাইয়ুনে আল-সাব্বান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ এবং তাইজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা, নার্সিং ও ফার্মেসি বিষয়ে তিনটি নতুন কলেজ নির্মাণে অগ্রগতি করেছে।
সৌদি কর্মসূচিটি ইয়েমেনের ১১টি গভর্নরেটে ৬০টি শিক্ষা উদ্যোগে সহায়তা করছে।
দ্বিতীয় প্রান্তিকে মানবসম্পদ উন্নয়নের অংশ হিসেবে কিং আবদুলআজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে ৫০০ ইয়েমেনি শিক্ষক-শিক্ষিকার জন্য ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের কমিউনিকেশনস, স্পেস অ্যান্ড টেকনোলজি কমিশনের সহযোগিতায় ৪৪ জন স্থানীয় বিশেষজ্ঞকে উন্নত টেলিযোগাযোগ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।